ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

এনবিআর সংস্কারে আইএমএফের কড়া নজর, কর-জিডিপি বাড়াতে সরকারের রোডম্যাপ জানতে চায় প্রতিনিধি দল

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ১১:২১ এএম

এনবিআর সংস্কারে আইএমএফের কড়া নজর, কর-জিডিপি বাড়াতে সরকারের রোডম্যাপ জানতে চায় প্রতিনিধি দল

ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিশেষ করে এনবিআরকে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’—এই দুই পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার সরকারি উদ্যোগের সর্বশেষ অবস্থান জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।

একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে, আগামী কয়েক বছরে রাজস্ব আহরণ কীভাবে বাড়ানো হবে এবং নতুন অর্থবছরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।

সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এনবিআর সূত্র বৈঠকের বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছে।

বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব-এর নেতৃত্বে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। অন্যদিকে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। আলোচনায় নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, কর সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি গুরুত্ব পায়।

এনবিআর বিভক্তির সিদ্ধান্তে অনড় সরকার

বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজস্ব প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে এনবিআরকে দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসেনি।

নতুন কাঠামো অনুযায়ী—

রাজস্ব নীতি বিভাগ কর আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, গবেষণা, বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর আদায়, নিরীক্ষা, গোয়েন্দা কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের প্রশাসন এবং কর সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করবে।

যদিও এনবিআরের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরোধিতার মুখে সরকার আগের অধ্যাদেশ পুরোপুরি বাতিল না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। বৈঠকে আইএমএফকে জানানো হয়, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, এই সূচকে বাংলাদেশ কেবল ইয়েমেন ও সুদানের সামান্য ওপরে অবস্থান করছে।

চলতি বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে এটি ১০.৭ শতাংশে উন্নীত করা।

এই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর আইএমএফকে জানিয়েছে, করহার না বাড়িয়ে বরং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—

রাজস্ব ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন
জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত করজাল সম্প্রসারণ
কর ফাঁকি প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি
বকেয়া রাজস্ব দ্রুত আদায়
ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা জোরদার
অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি না দেওয়া
এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির ব্যাখ্যা জানতে চাইল আইএমএফ

গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কীভাবে অর্জন করা হবে—এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে প্রতিনিধি দল।

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, কর প্রশাসনে ডিজিটাল রূপান্তর এবং করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা চলছে।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাঁচ দিনের সফরে বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।

বৈঠকে এনবিআরের উপস্থাপিত সংস্কার পরিকল্পনা ও রাজস্ব কৌশল নোট করে নিয়েছেন আইএমএফ কর্মকর্তারা। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে তারা এসব বিষয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।

শিল্প পুনরুজ্জীবনেও সরকারের বড় পরিকল্পনা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিনিয়োগ বাড়াতে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এছাড়া—

৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ,
বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা,
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ,
দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর নীতি বাস্তবায়নের বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের সঙ্গে পরবর্তী দফার আলোচনায় নতুন ঋণচুক্তির অগ্রগতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, সম্ভাব্য নতুন জাতীয় পে-স্কেলের অর্থায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নিয়েও আলোচনা হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!