ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ (সিবিএমসিবি)-তে কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের পর কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মাহির ইবনের হোস্টেলের বরাদ্দকৃত সিট সাময়িকভাবে বাতিল করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাকে হোস্টেল প্রাঙ্গণে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পর কলেজ প্রশাসনের জরুরি সভায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কলেজের ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাসে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) কলেজ প্রশাসনের জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কনসার্ট ঘিরে সংঘর্ষ, ছুরিকাঘাতের অভিযোগ
কলেজ ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ আগস্ট সিবিএমসিবির ৩১ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সিবিএমসিবি ডে’ উদযাপন করা হয়। দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির পর রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠান চলাকালে একপর্যায়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয়। পরে কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনা ঘটে বলে শিক্ষার্থীরা জানান।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্রদল নেতা মাহির ইবনের নেতৃত্বে আসা একদল বহিরাগত ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তবে অভিযোগটির বিষয়ে মাহির ইবনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনে উত্তাল ক্যাম্পাস
ঘটনার পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২০ আগস্ট সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে ১৭ ও ১৮ আগস্টের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে মাহির ইবনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বয়কটের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত ক্লাস ও পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, হোস্টেল প্রাঙ্গণে মাহির ইবনকে পুনরায় দেখা গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জরুরি সভায় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত
শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ আগস্ট সকালে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মোর্শেদ আলমের সভাপতিত্বে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা শেষে অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাহির ইবনের মেডিকেল রোল-৫৪-এর বরাদ্দকৃত হোস্টেল সিট সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাকে হোস্টেল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাসে সব ধরনের বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কে এই মাহির ইবন?
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মাহির ইবন ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের (সিবি-২৭ ব্যাচ) পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বর্তমানে সিবিএমসিবি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল পাঁচ সদস্যের কমিটি অনুমোদন করে। ওই কমিটিতে মাহির ইবনকে সভাপতি এবং ফারহান ইশরাককে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় এই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে হোস্টেল সিট বাতিলের সিদ্ধান্তকে ঘিরে ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক এলাকায় বহিরাগতদের প্রবেশ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তাদের দাবি, শুধু সিট বাতিল করলেই হবে না; ১৭ ও ১৮ আগস্টের ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল এবং তাদের প্রবেশে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা অবহেলা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে, কলেজ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে আপাতত আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ দেখা গেলেও অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানা যায়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিট বাতিল হওয়া ছাত্রদল সভাপতি মাহির ইবন এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মোর্শেদ আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

