ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

কুকি-চিনের পোশাক বানাতে কোটি টাকা লেনদেন, নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে সিআইডির মামলা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

কুকি-চিনের পোশাক বানাতে কোটি টাকা লেনদেন, নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে সিআইডির মামলা

ছবিঃ সংগৃহীত

পাহাড়ের সশস্ত্র ও নিষিদ্ধ সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর পোশাক তৈরি এবং সংগঠনটির কার্যক্রমে অর্থায়নের অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে কেএনএফের প্রায় ৪০ হাজার সেট ক্যামোফ্লেজ পোশাকের কাপড় তৈরি ও সেলাই বাবদ ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ লেনদেন ও ব্যবসায়িক নথিপত্র পর্যালোচনার পর অর্থের উৎস ও ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনে সংস্থাটি।

গত ৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলাটি করা হয়। মামলাটির নম্বর ১৩। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহর সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মামলার বিষয়টি জানানো হয়।

নাথান বমসহ মামলার ৯ আসামি

মামলায় কেএনএফ প্রধান নাথানা লনচেও ওরফে নাথান বম (৪৯) ছাড়াও রয়েছেন মংহলাসিন মারমা ওরফে মং (৩৮), নিয়াজ হায়দার (৩৯), মো. গোলাম আজম (৪৭), সাহেদুল ইসলাম (২৭), মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (৫৮), জামালুল ইসলাম (৪৫), মো. তৌহিদুল ইসলাম (৩৮) এবং মো. মতিউর রহমান (৪৩)।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কেএনএফের পোশাক তৈরির জন্য অর্থের লেনদেন করেছেন এবং এসব অর্থের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহার আড়াল করার চেষ্টা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে মাত্র; তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে গণ্য করা যাবে না।

যেভাবে সামনে আসে কেএনএফের পোশাক তৈরির তথ্য

সিআইডি জানায়, ২০২৫ সালের ১৮ মে রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালায়।

অভিযানে কেএনএফের পোশাক তৈরির সঙ্গে যুক্ত একজনকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে হালিশহরের ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তীতে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার একটি গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি পোশাক কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট কেএনএফের চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়।

দুই জায়গা থেকে উদ্ধার করা পোশাকের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার ৩০০ সেট।

এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করা হয়েছিল।

পোশাক তৈরির অর্থের উৎস খুঁজতে তদন্ত

পোশাক উদ্ধারের ওই মামলার পর কেএনএফের পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত অর্থের উৎস ও লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি।

তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংকিং হিসাব, চেক, নগদ অর্থ লেনদেন এবং ব্যবসায়িক নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়। এসব নথি বিশ্লেষণ করে পোশাক তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে সিআইডি।

‘MI Enterprise’-এর পরিচয়ে যোগাযোগ

সিআইডির অনুসন্ধান অনুযায়ী, কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা নাথান বমের নির্দেশে সংগঠনটির প্রতিনিধি মংহলাসিন মারমা ওরফে মং ছদ্মপরিচয়ে নিজেকে ‘MI Enterprise’-এর সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দেন।

তদন্তকারীদের দাবি, এরপর তিনি মধ্যস্থতাকারী নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজমের মাধ্যমে পোশাক তৈরির কারখানাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এই যোগাযোগের মাধ্যমে কেএনএফের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় তৈরি ও পোশাক সেলাইয়ের ব্যবস্থা করা হয় বলে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে।

ফ্যাব্রিকস তৈরিতে দেওয়া হয় ৯০ লাখের বেশি টাকা

সিআইডির অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০২৪ সালের নভেম্বর এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুটি কার্যাদেশের মাধ্যমে ফ্যাব্রিকস তৈরির জন্য মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করা হয়।

এর বাইরে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশন নামের কয়েকটি পোশাক কারখানাকে ৪০ হাজার সেট প্যান্ট ও শার্ট সেলাইয়ের মজুরি বাবদ আরও ৭২ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং নগদ লেনদেনের মাধ্যমে ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা স্থানান্তরের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

৪০ হাজার সেট পোশাক তৈরির লেনদেন

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট লেনদেনের উদ্দেশ্য ছিল প্রায় ৪০ হাজার সেট কেএনএফের প্যান্ট ও শার্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় তৈরি এবং পোশাক সেলাই করা।

একদিকে কাপড় তৈরির জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সেলাইয়ের মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। সিআইডি এখন এসব লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব এবং অর্থের উৎস আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে।

মানিলন্ডারিং আইনে কেন মামলা?

সিআইডির বক্তব্য অনুযায়ী, কেএনএফের কার্যক্রম জোরদারে ব্যবহৃত পোশাক তৈরির অর্থের উৎস ও প্রকৃত ব্যবহার গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।

সিআইডি বলছে, তদন্তের মাধ্যমে অর্থের উৎস, লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও স্পষ্ট করা হবে।

আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে সিআইডি

মামলার তদন্ত এখানেই শেষ নয়। কেএনএফের পোশাক তৈরির অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিআইডির তদন্তকারীরা ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের নথি, চেক, নগদ অর্থের প্রবাহ এবং ব্যবসায়িক কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করছেন।

তদন্তে নতুন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পোশাক তৈরির আড়ালে অর্থায়নের অভিযোগ

সিআইডির দাবি, কেএনএফের মতো একটি সশস্ত্র সংগঠনের জন্য বিপুলসংখ্যক ক্যামোফ্লেজ পোশাক তৈরি করতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এসব পোশাক সংগঠনটির সদস্যদের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, পোশাক তৈরির অর্থের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহার আড়াল করার চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় তদন্তের বিষয়।

এ কারণে শুধু পোশাক তৈরির কারখানা বা মধ্যস্থতাকারীদের নয়, পুরো অর্থের প্রবাহ এবং এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।

তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে অর্থায়নের আরও তথ্য

মামলার তদন্তে এখন মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—কেএনএফের পোশাক তৈরির অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কারা অর্থের লেনদেন করেছে এবং শেষ পর্যন্ত এসব অর্থ কীভাবে সংগঠনটির কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, অর্থায়ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা উন্মোচনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ফলে ৪০ হাজার সেট পোশাক তৈরিতে ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকার লেনদেন ঘিরে শুরু হওয়া এই মামলা কেএনএফের অর্থায়ন কাঠামো সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!