ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সাপাহারের ৮৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন মাস ধরে অচল ইন্টারনেট, ব্যাহত দাপ্তরিক কার্যক্রম

বাবুল আকতার রানা,স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁঃ

প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০২:০৪ পিএম

সাপাহারের ৮৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন মাস ধরে অচল ইন্টারনেট, ব্যাহত দাপ্তরিক কার্যক্রম

ছবিঃ সংগৃহীত

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ৮৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় তিন মাস ধরে ইন্টারনেট সংযোগ অচল হয়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়গুলোতে সংযোগ স্থাপনের পরও ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে অনলাইন হাজিরা, দাপ্তরিক তথ্য আদান-প্রদান, বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রমসহ শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

ইন্টারনেট-নির্ভর এসব কার্যক্রম চালু রাখতে বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষক ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ডাটা কিনে ব্যবহার করছেন। কোনো কোনো বিদ্যালয় আবার স্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নতুন সংযোগ নিয়েও দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষকরা অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থে স্থাপিত ইন্টারনেট অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংযোগ আছে, কিন্তু ইন্টারনেট চলে না

শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাইরে থেকে সংযোগ থাকার বিষয়টি দেখা গেলেও বাস্তবে অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে নিয়মিত অনলাইন হাজিরা দেওয়া, দাপ্তরিক নির্দেশনা গ্রহণ, তথ্য পাঠানো, বিভিন্ন অনলাইন ফরম পূরণ এবং শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।

বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম ক্রমেই অনলাইননির্ভর হয়ে পড়ায় ইন্টারনেট সংযোগ অচল থাকার প্রভাব সরাসরি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে পড়ছে।

ব্যক্তিগত খরচে ইন্টারনেট চালাচ্ছেন শিক্ষকরা

সাপাহার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল অনেক কাজের জন্য ইন্টারনেট অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সংযোগ থাকলেও প্রায় তিন মাস ধরে কোনো কাজ হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল অনেক কাজের জন্য ইন্টারনেট অত্যন্ত জরুরি। আমাদের ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও প্রায় তিন মাস ধরে কোনো কাজ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে নতুন করে স্থানীয় ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে দাপ্তরিক কাজ চালাতে হচ্ছে।”

অন্যদিকে শিক্ষক শামীম আহমেদ বলেন, অনলাইনে হাজিরা দেওয়ার প্রয়োজন হয় এবং সেই হাজিরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। ইন্টারনেট না থাকায় তাকে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ডাটা কিনে এসব কাজ করতে হচ্ছে।

তার ভাষায়, “আমাদের অনলাইনে হাজিরা দিতে হয়। সেই হাজিরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দিতে হয়। ইন্টারনেট না থাকায় এখন বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত ফোনে এমবি কিনে কাজ করতে হচ্ছে।”

বাড়তি খরচ ও ভোগান্তিতে বিদ্যালয়

শিক্ষকদের ভাষ্য, সরকারি ব্যবস্থাপনায় ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার পর তারা সেটির ওপর নির্ভর করেই দাপ্তরিক কাজ করছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংযোগ অকার্যকর থাকায় অনেক শিক্ষককে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে মোবাইল ডাটা কিনতে হচ্ছে।

কোনো কোনো বিদ্যালয়কে আবার বিকল্প হিসেবে স্থানীয় ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হয়েছে। ফলে একই কাজের জন্য সরকারি সংযোগের পাশাপাশি বিকল্প সংযোগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে এ ধরনের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হবে এবং সরকারি অর্থে স্থাপিত অবকাঠামোর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

শিক্ষকদের ক্ষোভ

দমদমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাকারিয়া আলম বলেন, ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার পর বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কাজের গতি অনেক বেড়েছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রায় তিন মাস ধরে সংযোগ থাকলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন রামাশ্রম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ, ওড়নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা।

তাদের দাবি, সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করা না হলে বিদ্যালয়ের অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কোন প্রকল্পের আওতায় দেওয়া হয়েছিল সংযোগ?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি)-১ম সংশোধিত’ প্রকল্পের আওতায় এসব বিদ্যালয়ে ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়।

এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

সমঝোতা অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে End User Connectivity-এর মাধ্যমে উচ্চগতির ২০ এমবিপিএস ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

সংযোগের বিল দেবে বিদ্যালয়

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সংযোগ স্থাপনের পর এর মাসিক ইন্টারনেট বিল বিদ্যালয়গুলোকে বহন করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থাপিত সংযোগ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং সেবার মান বজায় রাখার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের তারিখ থেকে তিন বছর কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।

তবে এরই মধ্যে সাপাহারের ৮৩টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট সেবা অচল থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা অফিসে একের পর এক অভিযোগ

সাপাহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যার বিষয়ে অভিযোগ আসছে।

সাপাহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ওয়াহেদুল্লাহ প্রামাণিক বলেন, “প্রায় তিন মাস ধরে বিভিন্ন স্কুল থেকে ইন্টারনেট সমস্যার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদেরকে বারবার জানানো হলেও তারা এখনো কার্যকর কোনো সমাধানের ব্যবস্থা নেয়নি।”

তিনি আরও বলেন, দ্রুত সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন করা হবে।

‘সার্ভারে সমস্যা’, বলছে সংশ্লিষ্ট আইটি প্রতিষ্ঠান

শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে আইটি ইঞ্জিনিয়ার শওকত হোসেন সুইটের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাদের সার্ভারে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। এ কারণে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং দ্রুত তা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

তবে প্রায় তিন মাস ধরে সমস্যা থাকার বিষয়টি তিনি সঠিক নয় বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, “আমাদের সার্ভারে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। যার কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে তিন মাস ধরে সমস্যা এটি সঠিক নয়।”

ফলে একদিকে বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকরা প্রায় তিন মাস ধরে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারার অভিযোগ করছেন, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট আইটি প্রকৌশলী সমস্যার মেয়াদ নিয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন।

ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থায় ইন্টারনেটের গুরুত্ব

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ক্রমেই ডিজিটাল ও অনলাইননির্ভর হচ্ছে। শিক্ষকদের উপস্থিতি, দাপ্তরিক নির্দেশনা, তথ্য আদান-প্রদান, বিভিন্ন প্রতিবেদন পাঠানো এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট সংযোগ অকার্যকর থাকলে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সেবা ব্যাহত হয় না; বিদ্যালয়ের নিয়মিত প্রশাসনিক কাজেও এর প্রভাব পড়ে।

বিশেষ করে অনলাইন হাজিরার মতো নিয়মিত কার্যক্রমে সমস্যা হলে শিক্ষকরা ব্যক্তিগত ডাটা ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এতে সরকারি ব্যবস্থায় স্থাপিত সংযোগের পাশাপাশি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অর্থ ও সময় ব্যয়ের বিষয়টিও সামনে আসে।

দ্রুত সমাধানের দাবি

শিক্ষকরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ডিজিটাল সেবা সহজ করা এবং বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা। কিন্তু সংযোগ স্থাপনের পর সেটি দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

তাই সাপাহারের ৮৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করে স্থায়ীভাবে সমাধান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা হলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সার্ভারজনিত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। এখন শিক্ষকদের অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে দ্রুত সেবা পুরোপুরি সচল করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!