বাংলাদেশ শুধু বাঙালি সংস্কৃতির দেশ নয়; এ দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য, উৎসব ও জীবনধারা। চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, মণিপুরী, ওরাওঁ, খাসিয়াসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শতবর্ষের ঐতিহ্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
উপজাতিভেদে ভাষা, পোশাক, আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনযাত্রায় পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা ও সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসের মিল দেখা যায়। কৃষিকাজ, ঋতুচক্র এবং প্রকৃতিকে ঘিরেই তাদের অধিকাংশ উৎসব ও সামাজিক আচার গড়ে উঠেছে।
মণিপুরীদের রাসনৃত্য, সাঁওতালদের শস্য উৎসব ‘সাহরাই’, গারোদের ‘ওয়াঙ্গালা’, ওরাওঁদের ফাগুয়া উৎসব এবং রাখাইনদের নববর্ষ উদযাপন উপজাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ। এসব উৎসবে নাচ, গান, বাদ্যযন্ত্র এবং লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করেন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ।

ধর্মীয় বিশ্বাসেও রয়েছে বৈচিত্র্য। পার্বত্য অঞ্চলের কিছু জনগোষ্ঠী বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করলেও গারো, সাঁওতাল ও ওরাওঁসহ অনেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও আদি বিশ্বাস, লোকজ সংস্কার এবং প্রকৃতিপূজার নানা উপাদান বিদ্যমান। তাদের সৃষ্টি-সম্পর্কিত পৌরাণিক কাহিনিগুলোও লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপজাতিদের জীবন ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিকাজ, বিশেষ করে জুম চাষ। ভূমিকে মাতৃরূপে বিবেচনা করে শস্য উৎপাদনের আগে বিভিন্ন আচার পালন করা হয়। কৃষিকাজে নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণও তাদের সামাজিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
বিবাহ, পোশাক, অলংকার ও খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে স্বতন্ত্রতা। চাকমাদের ‘পিন্ধন’, মারমাদের ‘থামি’, সাঁওতালদের ‘পাঁচি’ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী অলংকার তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। একই সঙ্গে মাচাং ঘর, লোকজ শিল্পকলা এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিজস্ব রীতিনীতিও তাদের সংস্কৃতিকে করেছে বৈচিত্র্যময়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিকতার প্রভাবে অনেক উপজাতীয় ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই বাংলাদেশের এই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

