পাবনার ঈশ্বরদীতে টানা ১৫ দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং কখনো মুষলধারে বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সবজি চাষ। অতিবৃষ্টির পানি জমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শত শত একর সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। দীর্ঘসময় জলাবদ্ধ থাকায় ক্ষেতের ফসল ও গাছের গোড়ায় পচন ধরেছে। এতে ব্যাপক লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
ঈশ্বরদীর ভাড়ইমারী, নওদাপাড়া, আমসারদাইড়, জগন্নাথপুর, আওতাপাড়া, সিলিমপুর, চরগড়গড়ী, মুলাডুলি, বাঘহাছলা ও চরমিরকামারীসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনকারী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ নিচু জমিতে পানি জমে আছে। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও তার চেয়েও বেশি পানির নিচে রয়েছে সবজি ক্ষেত।
ঢেঁড়শ, পটল, চিচিঙ্গা, ঝিঙা ও শিমের ক্ষেতেও জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুলা, ধনেপাতা ও আগাম ফুলকপির ক্ষেত। অনেক জমিতে ইতোমধ্যে পচন ধরে ফসল নষ্ট হতে শুরু করেছে।

পানির নিচে তিন বিঘার ঢেঁড়শ ক্ষেত
চরমিরকামারী এলাকার কৃষাণী মোছা. শিরিন খাতুন বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে ঢেঁড়শ চাষ করেছি। এখন পুরো জমিতে এক হাঁটু পানি। বৃষ্টির মধ্যেই পানিতে নেমে ঢেঁড়শ তুলছি। কিন্তু গাছে নতুন করে ফুল আসছে না। আবার গাছের গোড়ায় পানি জমে পচন ধরেছে। আর কয়েক দিন পানি জমে থাকলে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ক্ষেত প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে ইতোমধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন ফসল নষ্ট হলে সেই খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়বে।
বৃষ্টিতে পচে শেষ মুলার ক্ষেত
মুলা চাষি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মুলা খুব সংবেদনশীল ফসল। আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন হলেই পচন ধরতে পারে। প্রতিবছর জমি লিজ নিয়ে মুলা চাষ করি। এবারও ভালো ফলনের আশা ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ক্ষেতের মুলা পচে প্রায় সব শেষ।’
কৃষকেরা জানান, অতিবৃষ্টির কারণে শুধু বর্তমান ফসলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; জমিতে পানি জমে থাকায় পরবর্তী আবাদও পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে মৌসুমি সবজি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আড়াই ফুট পানিতে সাড়ে পাঁচ বিঘার শিম
শিমচাষি আব্দুল মজিদ বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম জাতের অটো শিম লাগিয়েছি। পুরো জমিতেই প্রায় আড়াই ফুট পানি জমেছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে পুরো জমি তলিয়ে যাবে। এখনই পানি নেমে গেলেও গাছের ব্যাপক ক্ষতি হবে। পানি বেশি দিন থাকলে গাছ শুকিয়ে যাবে এবং পচন ধরবে।’
তার মতো অনেক কৃষকই এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। বৃষ্টি থেমে দ্রুত পানি নেমে না গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ক্ষেত তলিয়ে বাজারে বাড়ছে সবজির দাম
অন্যদিকে, ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকার সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাজারে স্থানীয়ভাবে সবজির সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।
উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি বেগুন ১২০ টাকা, করলা ৮০, পটল ৫০, কাঁকরোল ৬০, ঢেঁড়শ ৫০, মিষ্টি কুমড়া ৫০, বরবটি ৬০, পেঁপে ২৫ থেকে ৩০, হাইব্রিড শসা ৪০, দেশি শসা ৯০, কচু ৫০, ধুন্দল ৩০, ওল ৭০, ঝিঙা ৪০ এবং কচুর লতি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া আকারভেদে প্রতিটি লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং প্রতিটি চালকুমড়া প্রায় ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অতিবৃষ্টির কারণে মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রভাব যুক্ত হওয়ায় সবজির বাজারে দামের চাপ তৈরি হয়েছে।
‘আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টি হতে পারে’
ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দীন বলেন, ঈশ্বরদীতে বেশ কয়েক দিন ধরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানান তিনি।
ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণে কৃষি বিভাগ
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের কিছু জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে এবং পানি দ্রুত নেমে গেলে অনেক ক্ষেত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতির প্রভাবেও বাজারে সবজির দাম কিছুটা বেশি। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে সবজির বাজারে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে।
তবে কৃষকদের আশঙ্কা, বৃষ্টি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকলে শুধু নিচু এলাকার ক্ষেত নয়, অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির সবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও লোকসান বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে সবজির সরবরাহ আরও কমে গিয়ে ভোক্তাদের বাড়তি দামে সবজি কিনতে হতে পারে।

