শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, নীতিমালার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি, নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করানো এবং পোশাকবিধি নিয়ে বিতর্ক—বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগ ও আলোচনা সামনে এসেছে রাজধানীর মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে। এবার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অ্যাডহক কমিটির এখতিয়ার, প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড, বয়সসীমা যাচাই এবং স্বচ্ছতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটির অতীত নিয়োগ নিয়ে ২০২২ সালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। পরের বছর বিষয়টি অনুসন্ধানে নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর বাইরে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য এবং পোশাকবিধি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগগুলোর ধরন ও সময়কাল আলাদা হলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগে বিধিবিধান অনুসরণ, শিক্ষার পরিবেশ এবং জবাবদিহি নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্তের ফলাফল বা আইনগত সিদ্ধান্ত এক নয়। ফলে অভিযোগ, সরকারি নিরীক্ষায় উত্থাপিত আপত্তি এবং প্রমাণিত অনিয়মের মধ্যে পার্থক্য রেখে বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
১০ কর্মচারী নিয়োগে প্রশ্ন, অ্যাডহক কমিটির ক্ষমতা কতটুকু?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর ও ২৮ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষের স্বাক্ষরযুক্ত আরও দুটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে কম্পিউটার অপারেটর পদে লিখিত পরীক্ষার জন্য ২১ জন প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করা হয়। তালিকায় প্রথমে রয়েছে মোহাম্মদ বেলাল হোসেনের নাম। তাঁর বয়স নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল কি না, প্রার্থী বাছাইয়ে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং তালিকায় তাঁর অবস্থানের ভিত্তি কী—এসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠেছে অ্যাডহক কমিটির এখতিয়ার নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অ্যাডহক কমিটির দায়িত্ব মূলত প্রতিষ্ঠানের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। নিয়মিত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিটির ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ অবস্থায় ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোন বিধি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিবিধান, প্রযোজ্য নিয়োগ নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামো অনুসরণ করা প্রয়োজন। ফলে অ্যাডহক কমিটি কী ধরনের পদে, কোন শর্তে এবং কত মেয়াদের জন্য নিয়োগ দিতে পারে, তা নির্দিষ্ট বিধি ও অনুমোদনের আলোকে যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগকারীদের মতে, নিয়োগের আগে প্রার্থীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যাচাই, লিখিত পরীক্ষার তালিকা, পরীক্ষার নম্বর, চূড়ান্ত ফলাফল এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ বা পর্যালোচনার সুযোগ থাকা উচিত।
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গভর্নিং বডির সদস্য মো. শাহাদাত ঢালী নিয়োগ প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রার্থীদের যোগ্যতা ও নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি অ্যাডহক কমিটির আইনগত ক্ষমতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকলে লিখিত পরীক্ষা ও চূড়ান্ত নিয়োগের আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এগুলো খণ্ডকালীন নিয়োগ। অল্প অল্প বেতনে আমাদের লিফটম্যানদের সমস্যা, লিফটম্যান নাই। খণ্ডকালীন, অল্প বেতন।’
নিয়োগের মেয়াদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অ্যাডহক কমিটি, মানে সাধারণত খণ্ডকালীন বলা থাকলে তাদের মেয়াদ পর্যন্তই থাকে।’
অধ্যক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগগুলো খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের অংশ। তবে এসব নিয়োগের সুনির্দিষ্ট শর্ত, মেয়াদ, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট বিধির ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
অতীত নিয়োগে ডিআইএর আপত্তি, অনুসন্ধানে দুদক
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগসংক্রান্ত বিতর্ক নতুন নয়। ২০২২ সালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) একটি প্রতিবেদনে ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া চার শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ নিয়ে আপত্তি তোলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে ১১১ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত ৯৯ জনকে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছিল।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে গভর্নিং বডির রেজুলেশনে ৯৪ জন শিক্ষক নিয়োগের কথা থাকলেও ১৪২ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারীসহ মোট ১৪৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ রেজুলেশনে উল্লিখিত সংখ্যার তুলনায় ৫১ জন বেশি নিয়োগের তথ্য সামনে আসে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিভিন্ন শাখায় ৮৯ জন, বনশ্রী শাখায় ৬৯ জন এবং ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২১ সালে মুগদা শাখায় ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুসরণ করা হয়নি বলে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তিনজন সহকারী প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ ও সনদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
ডিআইএর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উত্থাপিত এসব আপত্তি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়টি সামনে আনে। তবে নিরীক্ষায় আপত্তি ওঠা মানেই প্রত্যেক নিয়োগে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট নথি, নিয়োগের অনুমোদন এবং পরবর্তী তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি অভিযোগের অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দুদকের অনুসন্ধানে কী হয়েছিল?
নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি হাতে নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সে সময় সংস্থাটি ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের তালিকা এবং প্রতিষ্ঠানের ১৩ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়েছিল।
দুদকের তৎকালীন কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক জানিয়েছিলেন, নিয়োগে অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল, কোনো মামলা হয়েছে কি না কিংবা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ কারণে পুরোনো অভিযোগের পাশাপাশি বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াও যথাযথ নথির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নীতিমালার বাইরে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে বিতর্ক
নিয়োগের বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়েও ২০১৮ সালে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তখন আসনসংখ্যা ও ভর্তি নীতিমালা অনুসরণ নিয়ে গভর্নিং বডির সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধের অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগ ছিল, নির্ধারিত আসন পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। এক পক্ষ মোট ভর্তির ১৫ শতাংশ বা অন্তত ৩৬০ জন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির কথা বললেও অন্য পক্ষ প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
তৎকালীন গভর্নিং বডির সভাপতি সাবেক সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান বলেছিলেন, নীতিমালার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা উচিত হবে না। বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করালে অবৈধ বাণিজ্যের প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
অভিভাবক ফোরামের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছিল, আসন না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির উদ্যোগ বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত আসনের বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি হলে শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, পাঠদানের মান এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ওই সময়ে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোর অভিযোগ
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বড় পরিসরে কোচিং করানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকজন শিক্ষক কয়েকশ শিক্ষার্থীকে কোচিং করান। তাঁদের কারও কারও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০০ থেকে ৮০০, এমনকি প্রায় এক হাজার পর্যন্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর শাহজাহানপুর, বনশ্রী ও শাহজাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব কোচিং পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নিজাম উদ্দিন কামালের বিরুদ্ধে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে কোচিং করানোর অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা কী (এত শিক্ষার্থী) সম্ভব?’ কতজনকে কোচিং করান জানতে চাইলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।
সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক সাখাওয়াত সোহেলের বিরুদ্ধে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীকে কোচিং করানোর অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোনের লাইন কেটে দেন।
ইংরেজি শিক্ষক শরীফ পেনু বলেন, ‘আমি এখন ছাত্র পড়াই না।’
গণিতের শিক্ষক জিসান আহমদ ৫০০ থেকে ৬০০ শিক্ষার্থী পড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আপনি এসে ভিজিট করে যান, আমি অল্প কিছু ছাত্র পড়াই। প্রতি ব্যাচে ২০ জনের বেশি পড়াই না।’
নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিজ স্কুল বলতে আমি যে শাখায় ক্লাস নিই, সেই শাখার কোনও শিক্ষার্থীকে পড়াই না। অন্য শাখার স্টুডেন্ট পড়াই। অন্য শাখার স্টুডেন্ট তো অন্য স্কুলের মতোই।’
ইংরেজির শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমার অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী, টেনেটুনে চলে আর কী।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমন কোনও টিচার নেই যে পড়ান না। যারা ভালো টিচার তারা সবাই পড়ায়।’
অন্যদিকে ইংরেজির শিক্ষক মুরাদ আহমেদ কোচিং করানোর অভিযোগকে ‘মিথ্যা বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক মহিউদ্দিনও ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী পড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন ১০০ জনেরও কম।
এসব বক্তব্যে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কেউ কেউ শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কোচিংয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থীসংখ্যা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের পরিচয়, কোচিংয়ের স্থান, সময়সূচি এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
কোচিং নীতিমালা কী বলছে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ অনুযায়ী, শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। নীতিমালায় নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের বাইরে সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ এবং এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
নীতিমালায় বাণিজ্যিকভাবে কোচিং পরিচালনা, শিক্ষার্থী সংগ্রহ এবং কোচিংয়ের প্রচার-প্রচারণার ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।
তাই কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাচ্ছেন কি না, তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কোন শাখার, কোন শ্রেণিতে পড়েন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক তাঁদের নিয়মিত পাঠদান করেন কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে নীতিমালা লঙ্ঘনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে রিটকারী অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘আইন করে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। লোক দেখানো নীতিমালা দিয়ে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা যাবে না। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হলে কোচিং বাণিজ্য নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কোচিংবাজ শিক্ষকদের বিভিন্ন মেয়াদি শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও সরকারি মনিটরিং জোরদার করলে কোচিং বাণিজ্য অনেকটা বন্ধ হবে। শিক্ষকদের কোচিং সেন্টার থেকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আর্থিক সংকটের প্রসঙ্গ
কোচিংয়ের বিষয়ে শিক্ষক মহিউদ্দিনের বক্তব্যে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
তাঁর দাবি, সরকারি নীতিমালায় একটি শ্রেণিতে ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও তাঁদের প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে সবার পড়া সমানভাবে কভার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকায় বাসাভাড়াসহ জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় শিক্ষকদের বেতন কম বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো এবং অবসরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমতে পারে।
তবে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকদের আর্থিক সংকট কোচিং নীতিমালা লঙ্ঘনের বৈধতা তৈরি করে না। বরং শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীর অনুপাতে শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা এবং নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ছেলেদের পোশাকবিধিতে টুপি বাধ্যতামূলক করা নিয়েও বিতর্ক
২০২৪ সালের আগস্টে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছেলেদের পোশাকবিধিতে টুপি বাধ্যতামূলক করা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
১২ আগস্টের একটি বিজ্ঞপ্তিতে ছেলেদের জন্য টুপি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল। পরদিন সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য টুপি পরা বাধ্যতামূলক। নতুন পোশাকবিধি ১৪ আগস্ট থেকে কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছিল।
এ ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকবিধি প্রণয়ন, ধর্মীয় অনুশীলন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পোশাকবিধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো পরিবর্তন কার্যকর করার আগে তার উদ্দেশ্য, পরিধি ও প্রয়োগের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো হলে ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষের বক্তব্য
প্রতিষ্ঠানে কোচিং করানো শিক্ষক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ বলেন, তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে কি না, সেটি দেখা তাঁর দায়িত্বের অংশ। তবে কোনো শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে বাসায় বা অন্য স্থানে কোচিং করালে তা তদারক করা কঠিন।
তিনি বলেন, ‘আমি এখানে নতুন, সাড়ে তিন মাসের। আমি যেটা, মানে আমার কলেজের বা স্কুলের যে বিষয়, ক্লাসটা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, এর বাইরে ধরেন একজন মানুষ বাসাবাড়িতে করলো, কেউ ঘরে করলো, এটা তো আমার খোঁজ নেওয়া মুশকিল।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘রেড দেওয়া আমাদের কাজ না। এটা পুলিশের অ্যাকচুয়ালি, শিক্ষা মানে ডিসি সাহেবের, শিক্ষা ডিপার্টমেন্ট, ডিসি সাহেব, এডিসি শিক্ষা, এগুলা কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। আমি যদি আমার কলেজে করতো, আমি বুঝতে পারতাম। আমাদের তো লোকের বিষয়, ক্ষমতা আমাদের দেওয়া নেই।’
শিক্ষকদের আর্থিক সংকট ও কোচিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সমাজে চলতে হলে তো আপনাকে অনেকগুলা জিনিস অ্যাভয়েড করা যায় না। যারা সিনিয়র আছে, তারাও কোচিং করে। আমাদের অনেকগুলা সমন্বয় করে আমরা যারা প্রশাসক, আপনি বুঝবেন, প্রশাসক গতি রাখতে হয়। তাছাড়া তো অনেক সময় সমস্যা হয়।’
প্রতিষ্ঠানটি অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় আসা প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমি তিন মাসে এসে যা দেখছি, এটা কিছুটা সমস্যা ছিল। আগে শুনছি, এটা মনে ছিল। যা ঘটে, যা রটে, কিছু না কিছু ঘটে, কিছুটা ছিল আগে।’
নিজের দায়িত্বকালে অনিয়ম হয়নি দাবি করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমি আসার পরে সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে আমরা সবকিছু সরকারি নিয়ম মাফিক করার চেষ্টা করছি। আপনি দেখেন, আমি এখনও অফিসে। সাড়ে ৮টায় ঢুকি, ৯টার মধ্যে নিয়ে থাকি, ছেলেদের লেখাপড়া, অফিসিয়াল কাজ। আমার এই যে তিন মাসে আমি আসছি, এর ভেতরে কোনও অনিয়ম হয়নি একদম।’
ভবিষ্যতে অনিয়ম হবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমস্যা আছে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে সমস্যার সমাধান হবে।’
অধ্যক্ষের বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত কোচিং তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং অতীতের সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে নিয়োগের বৈধতা, প্রার্থী বাছাইয়ের স্বচ্ছতা এবং কোচিং নীতিমালা বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী করা প্রয়োজন?
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বর্তমান নিয়োগ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, নিয়োগের আইনগত ভিত্তি যাচাই: অ্যাডহক কমিটির ক্ষমতা, নিয়োগের অনুমোদন, পদের ধরন এবং নিয়োগের মেয়াদ সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী পরীক্ষা করা।
দ্বিতীয়ত, প্রার্থী বাছাইয়ের নথি পর্যালোচনা: বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আবেদনপত্র যাচাই, লিখিত পরীক্ষার তালিকা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, পুরোনো নিরীক্ষা আপত্তির অগ্রগতি প্রকাশ: ডিআইএর প্রতিবেদনে উত্থাপিত আপত্তি এবং দুদকের অনুসন্ধানের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ করা।
চতুর্থত, কোচিং নীতিমালা বাস্তবায়ন: অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য যাচাই করা এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
পঞ্চমত, ভর্তি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে জবাবদিহি: আসনসংখ্যা, ভর্তি নীতিমালা, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতের তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য অভিযোগ অস্বীকার বা পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরে গিয়ে নথিভিত্তিক যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুনাম রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে বর্তমান নিয়োগ বিতর্কের সঙ্গে অতীতের নিরীক্ষা আপত্তি, ভর্তি নিয়ে অভিযোগ, কোচিং বাণিজ্য এবং পোশাকবিধির আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। এসব ঘটনার সবগুলো একই ধরনের নয় এবং সব অভিযোগের সত্যতাও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবু বারবার বিতর্ক তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিধিবিধান অনুসরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে অ্যাডহক কমিটির এখতিয়ার, ১০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের ভিত্তি এবং প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পাশাপাশি অতীতের নিরীক্ষা আপত্তি ও কোচিংসংক্রান্ত অভিযোগের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা জরুরি।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নথির স্বচ্ছতা এবং প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণই পারে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে।

