ঢাকা রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আট মণ চাল: সত্যিই কি তখন মানুষ সুখে ছিল?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১০:১৪ এএম

শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আট মণ চাল: সত্যিই কি তখন মানুষ সুখে ছিল?

ছবিঃ সংগৃহীত

বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেই বাংলাদেশের মানুষের আলোচনায় ফিরে আসে মুঘল আমলের সুবাদার শায়েস্তা খানের সময়। প্রচলিত ইতিহাসে তাঁর আমলকে এমন এক সময় হিসেবে তুলে ধরা হয়, যখন টাকায় আট মণ পর্যন্ত চাল পাওয়া যেত। এমনকি কথিত আছে, ঢাকা ছাড়ার সময় শায়েস্তা খান লালবাগ দুর্গের পশ্চিম গেট বন্ধ করে দিয়ে সেখানে একটি শিলালিপি স্থাপন করেছিলেন—চালের দাম তাঁর সময়ের মতো সস্তা না হওয়া পর্যন্ত যেন ওই গেট না খোলা হয়।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আব্দুল করিম তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস’ বইয়ে শায়েস্তা খানের আমলের চালের দামের এই বিবরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গেটটি অর্ধশতকেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল। পরে ১৭৪০ সালে নবাব সরফরাজ খানের সময়ে চালের দাম আবার টাকায় আট মণ হলে গেটটি খোলা হয় বলে ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—সত্যিই কি শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত? আর যদি পাওয়া যেত, তাহলে কি তার অর্থ ছিল সাধারণ মানুষ তখন অত্যন্ত সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করত?

ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিষয়টি এতটা সরল নয়। চালের কম দাম যেমন উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, তেমনি তখনকার কৃষি ব্যবস্থা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, বিনিময়ভিত্তিক অর্থনীতি, মুদ্রার প্রকৃত মূল্য, করব্যবস্থা এবং চাল রপ্তানির মতো বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত ছিল।

টাকায় আট মণ চাল—কতটা সত্য?

শায়েস্তা খানের আমলে চালের দাম অত্যন্ত কম ছিল—এমন বর্ণনা শুধু একটি সূত্রে নয়, বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও বিবরণে পাওয়া যায়।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রাডলি বার্ট শায়েস্তা খানের শাসনামলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, তাঁর শাসনের স্মৃতি দীর্ঘদিন বাংলাজুড়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। প্রচলিত ছিল, তাঁর আমলে চাল এত সস্তা ছিল যে এক টাকায় ৭৪০ পাউন্ড বা প্রায় আট মণ চাল পাওয়া যেত।

কিছু ইতিহাসবিদের বর্ণনায় আবার আট মণের চেয়েও বেশি চাল পাওয়ার কথা উঠে এসেছে।

ইতিহাসবিদ ড. মুহাম্মদ মোহর আলী তাঁর ‘মুঘল আমলে বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, শায়েস্তা খান তাঁর এই সাফল্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই ঢাকা বা তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর ত্যাগের সময় তিনি পশ্চিম ফটকে এমন একটি বার্তা উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়—চালের দাম তাঁর সময়ের মতো সস্তা করতে পারলেই যেন সেই ফটক খোলা হয়।

ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক ড. নাসিমা হামিদের মতে, শায়েস্তা খানের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বিদেশি পর্যটকের বিবরণেও টাকায় আট মণ চাল পাওয়ার তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আব্দুল করিমও তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, শায়েস্তা খানের আগে বাংলায় এত সস্তা চালের সময় আর দেখা যায়নি।

লালবাগ দুর্গের পশ্চিম গেটের গল্প

শায়েস্তা খানের আমলের চালের দামের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে ঐতিহাসিক ঘটনাটি আলোচিত হয়, সেটি হলো লালবাগ দুর্গের পশ্চিম গেট বন্ধ করে দেওয়ার কাহিনি।

বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে বলা হয়েছে, চালের দাম টাকায় আট মণ না হওয়া পর্যন্ত ওই গেট বন্ধ রাখার নির্দেশ ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে গেটটি বন্ধ থাকার পর ১৭৪০ সালে নবাব সরফরাজ খানের সময় চালের দাম আবার টাকায় আট মণ হলে সেটি খোলা হয় বলে অধ্যাপক আব্দুল করিম ও অন্যান্য ঐতিহাসিকের লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

ফলে ‘টাকায় আট মণ চাল’ শুধু একটি বাজারদরের তথ্য হয়ে থাকেনি; এটি পরবর্তী সময়ে বাংলায় সস্তা বাজার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের একটি ঐতিহাসিক প্রতীক হয়ে ওঠে।

চাল এত সস্তা হওয়ার কারণ কী?

শায়েস্তা খানের আমলে চালের দাম কম থাকার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল বলে ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণে উঠে আসে।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে শায়েস্তা খান দুই দফায় প্রায় ২২ বছর বাংলার সুবাদার ছিলেন। তাঁর সময় বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা আসে। যুদ্ধ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কৃষি, রাজস্ব ও বাণিজ্য ব্যবস্থায়ও বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়।

অধ্যাপক আব্দুল করিমের ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, কৃষকদের দ্বৈত করের চাপ থেকে রক্ষা করা এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

এর আগে মীর জুমলার সুবাদারির শেষ দিকে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। সেই প্রেক্ষাপটে শায়েস্তা খানের সময় খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া শায়েস্তা খানের প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

কৃষি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার প্রভাব

শায়েস্তা খানের সময় কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ, বাজার তদারকি এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার কারণে খাদ্যশস্যের সরবরাহ বাড়তে পারে বলে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন।

গবেষক ড. নাসিমা হামিদের মতে, ওই সময় বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন ভালো ছিল এবং বাজারে সরবরাহও পর্যাপ্ত ছিল। ফলে চালের দাম কম থাকার পেছনে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এ ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী।

তাঁর মতে, শুধু চালের কম দামকে কেন্দ্র করে শায়েস্তা খানের আমলকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময় হিসেবে বিচার করা ঠিক হবে না। তখন কৃষকের উৎপাদনব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ প্রকৃতি ও শ্রমনির্ভর। রাসায়নিক সার, আধুনিক সেচব্যবস্থা বা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কোনো সুযোগ ছিল না।

তাই কম দামে চাল পাওয়া গেলেই কৃষক বা সাধারণ মানুষের জীবন স্বচ্ছল ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব

চালের কম দামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ইতিহাস গবেষকরা চাল রপ্তানির বিষয়টিও সামনে এনেছেন।

অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা থেকে চাল রপ্তানি হতো। ইউরোপীয় ও অন্যান্য বিদেশি বণিকেরা বাংলার বিভিন্ন বন্দর ও উপকূলীয় এলাকা থেকে চাল সংগ্রহ করতেন।

তখন ঢাকার মসলিন ছিল অত্যন্ত হালকা ও মূল্যবান পণ্য। সমুদ্রযাত্রায় জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিদেশি বণিকেরা মসলিনের পাশাপাশি ভারী পণ্যও বহন করতেন। চাল ছিল সেই ভারী পণ্যগুলোর একটি।

চালের এই রপ্তানি শায়েস্তা খানের নজরে আসার পর তিনি চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন বলে গবেষকদের একাংশের বক্তব্য।

রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে চালের সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে বাজারে চালের দাম আরও কমে গিয়ে টাকায় আট মণ বা তারও বেশি চাল পাওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে অধ্যাপক রাব্বানী মনে করেন।

অর্থাৎ, চালের কম দামকে শুধু কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়ানোর নীতিও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকায় চালের দাম তুলনামূলক কম ছিল কেন?

ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের বিশ্লেষণেও ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে।

ঢাকা ছিল বাংলার প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি। ফলে মধ্য বাংলার অন্যান্য এলাকার তুলনায় ঢাকায় চাল ও খাদ্যশস্যের দাম তুলনামূলক কম থাকা স্বাভাবিক ছিল।

তবে এর বিপরীত একটি বাস্তবতাও ছিল। তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বর্তমান সময়ের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ছিল। ফলে বাজারে কোনো পণ্য সস্তা হলেই যে তা প্রত্যেকের নাগালের মধ্যে ছিল, এমনটা বলা যায় না।

কম দাম মানেই কি মানুষের সুখ?

এখানেই শায়েস্তা খানের আমলের অর্থনীতি বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে।

আজকের দিনে আমরা সাধারণত কোনো পণ্যের দাম দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য বিচার করি। কিন্তু কয়েকশ বছর আগের বাংলার অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুঘল আমলে মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার বর্তমান সময়ের মতো ছিল না। সমাজের বড় অংশের লেনদেন চলত বিনিময় প্রথায়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেছেন, একজন নাপিত কারও চুল কাটলে প্রতিবার নগদ টাকা পাওয়ার পরিবর্তে বছরের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ধান বা অন্য কৃষিপণ্য পেতে পারেন।

অর্থাৎ, বাজারে চালের দাম কত ছিল—এই একটি তথ্য দিয়ে সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করা কঠিন।

তখনকার এক টাকা আর আজকের এক টাকা এক নয়

শায়েস্তা খানের আমলের ‘এক টাকা’কে বর্তমান সময়ের ‘এক টাকা’র সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাও ইতিহাসবিদদের মতে যুক্তিসংগত নয়।

মুঘল আমলের রৌপ্যমুদ্রা ছিল নির্দিষ্ট পরিমাণ রুপার তৈরি। সেই সময়ের এক টাকার মুদ্রার সঙ্গে বর্তমান সময়ের কাগুজে বা ধাতব এক টাকার কোনো সরাসরি অর্থনৈতিক তুলনা করা যায় না।

তখনকার মুদ্রাব্যবস্থায় কড়ি, গণ্ডা, পণ, আনা এবং টাকা—বিভিন্ন এককের প্রচলন ছিল।

প্রচলিত হিসাবে চার কড়িতে এক গণ্ডা, ২০ গণ্ডায় এক পণ এবং চার পণে এক আনা—এভাবে হিসাব করা হতো। ১৬ আনায় এক টাকা।

ফলে সেই সময়ের এক টাকা ছিল মূল্যমানের দিক থেকে বর্তমান সময়ের এক টাকার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি একক।

কড়িই ছিল সাধারণ মানুষের লেনদেনের মাধ্যম

ইতিহাস গবেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের হাতে রৌপ্যমুদ্রা খুব বেশি থাকত না। কৃষিপণ্য ও কড়ির মাধ্যমে দৈনন্দিন প্রয়োজনের অনেক লেনদেন সম্পন্ন হতো।

মালদ্বীপ থেকে চালের বিনিময়ে কড়ি আনার কথাও ইতিহাসের বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে।

অর্থাৎ, তখনকার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর ও আংশিক বিনিময়ভিত্তিক। অধিকাংশ পরিবার নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরাই উৎপাদন করত। বাজার থেকে চাল কিনে খাওয়ার প্রবণতা বর্তমান সময়ের মতো ব্যাপক ছিল না।

এই কারণে বাজারে চালের দাম কম থাকা এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা—দুটি বিষয়কে একই অর্থে দেখা যায় না।

কৃষকের অবস্থাও কি ভালো ছিল?

শায়েস্তা খানের আমলকে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করা হলেও কৃষকদের জীবন সবসময় স্বচ্ছল ছিল—এমন দাবি ইতিহাসের সব গবেষকের নয়।

অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর মতে, অতিরিক্ত খাজনা আদায় এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্যের যথাযথ মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি ছিল।

তাঁর যুক্তি হলো, কোনো একটি পণ্যের বাজারমূল্য কম থাকার অর্থ এই নয় যে উৎপাদক সেই পণ্য উৎপাদন করে পর্যাপ্ত আয় করছিলেন।

বরং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, শ্রম, কর এবং পণ্যের বিক্রয়মূল্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ওই সময়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করতে হবে।

শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী ছিল?

এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একটি জায়গায় যথেষ্ট মিল রয়েছে—শায়েস্তা খানের আমলে বাংলায় প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক ড. মো. আদনান আরিফ সালিমের মতে, শায়েস্তা খানের শাসনকাল বাংলার প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তাঁর শাসনামলে রাজস্ব ব্যবস্থাকে সংগঠিত করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বাংলার সুতি ও বস্ত্রশিল্প তখন আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি লাভ করে। মসলিনসহ বিভিন্ন বস্ত্র ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হতো। ফলে ঢাকা ও বাংলা বৃহত্তর মুঘল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অঞ্চলে পরিণত হয়।

বাণিজ্য বাড়লেও বৈষম্য ছিল

তবে অর্থনৈতিক বিকাশের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে পেয়েছিল—এমনটি বলা যায় না।

একদিকে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, কুটির ও বস্ত্রশিল্প বিকশিত হয়েছে, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এসেছে; অন্যদিকে কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ এবং উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য না পাওয়ার মতো সমস্যাও ছিল।

অর্থাৎ, শায়েস্তা খানের আমলকে একদিকে বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়, আবার অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে শুধু চালের দামকে একমাত্র সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

‘টাকায় আট মণ চাল’ কেন আজও এত আলোচিত?

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়লেই শায়েস্তা খানের আমলের ‘টাকায় আট মণ চাল’-এর প্রসঙ্গ ফিরে আসে।

এর কারণ শুধু চালের দাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি—একসময় বাংলার বাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহ এত বেশি ছিল যে চালের দাম ছিল অত্যন্ত কম।

কিন্তু ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, সেই সময়ের অর্থনীতি, মানুষের আয়, মুদ্রার মূল্য, কৃষি উৎপাদন, করব্যবস্থা এবং বাজার কাঠামো ছিল আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাই ‘টাকায় আট মণ চাল’কে বর্তমান সময়ের বাজারদরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে ইতিহাসের বাস্তব চিত্রের একটি অংশই দেখা হবে।

তাহলে শায়েস্তা খানের আমলকে কীভাবে দেখা উচিত?

ইতিহাসের বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে বলা যায়, শায়েস্তা খানের আমলে বাংলায় খাদ্যশস্যের সরবরাহ, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। কৃষি ও বাজার ব্যবস্থায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং বাংলার বস্ত্র ও কুটিরশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল।

চালের দাম কম থাকার পেছনে ভালো উৎপাদন, পর্যাপ্ত সরবরাহ, চাল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা—বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে, কৃষকের জীবনযাত্রা, করের চাপ এবং নগদ অর্থের সীমিত ব্যবহার বিবেচনায় না নিয়ে শুধু চালের দাম দিয়ে তখনকার মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিচার করা ঠিক হবে না।

অতএব, শায়েস্তা খানের আমলের ‘টাকায় আট মণ চাল’ নিঃসন্দেহে বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য ও স্মৃতি। কিন্তু এটি একই সঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি পণ্যের দাম কখনোই কোনো যুগের মানুষের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পূর্ণাঙ্গ মাপকাঠি নয়।

আজকের বাজারে চালের দাম বাড়লে তাই ইতিহাসের সেই আট মণের কথা মনে পড়তেই পারে। তবে কয়েক শতাব্দী আগের অর্থনীতি ও বর্তমান বাজারব্যবস্থাকে তুলনা করতে হলে শুধু দাম নয়—মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা, উৎপাদনব্যবস্থা, মুদ্রার মূল্য, করনীতি ও বাজার কাঠামোকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!