জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে ফসলি জমি থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন আলম ও তাঁর স্ত্রী মাহবুবা খাতুনকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমান সুমন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। শুক্রবার রাত ৮টার পর উপজেলার রুকিন্দিপুর ইউনিয়নের চক রোয়াইড় গ্রামের আজাদুলের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় আতিয়ার রহমান সুমনও আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছেন সুমন। তাঁর ভাষ্য, মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় আলমগীর ও তাঁর সমর্থকেরা তাঁর ওপর হামলা করেছেন।
দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বালু উত্তোলন নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, রোয়াইড় গ্রামের একটি ফসলি জমি খনন করে প্রায় এক মাস ধরে বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

বালু ও মাটি বহনের জন্য ট্রাক্টর চলাচল করায় গ্রামের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয়দের একটি অংশ এর প্রতিবাদ জানায়। বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত সোমবার পুলিশ একটি বালুবাহী ট্রাক্টর আটকে দিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে আবারও ট্রাক্টর চলাচল শুরু হয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ করা এবং বিরোধের সমাধানে আগামী শনিবার ইউনিয়ন বিএনপির নেতাদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই শুক্রবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিএনপি নেতার অভিযোগ
আহত আলমগীর হোসেন আলম রুকিন্দিপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি।
তিনি অভিযোগ করেন, ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে গ্রামের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। তিনি এর প্রতিবাদ করায় উপজেলা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমান সুমন ও তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন তাঁর ওপর হামলা করেন।
আলমগীরের দাবি, হামলার সময় তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী মাহবুবা খাতুনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। তাঁর মাথায় আঘাত লাগে এবং তাঁর স্ত্রীর বাম চোখের পাশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন আলমগীর।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি সুমনের
আতিয়ার রহমান সুমন আলমগীরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি দাবি করেন, বালু উত্তোলনের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। বরং এলাকায় মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় আলমগীর ও তাঁর সমর্থকেরা তাঁর ওপর হামলা করেছেন।
সুমন বলেন, “আমি বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নই এবং চাঁদা দাবির বিষয়টি ভিত্তিহীন।”
তাঁর নিজের হাতেও আঘাত লেগেছে বলে জানা গেছে এবং তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বৈঠকের আগেই সংঘর্ষ
রুকিন্দিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ছোয়াত জানান, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য শনিবার একটি বৈঠকের কথা ছিল।
তিনি বলেন, “শনিবার বৈঠকের কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই দুই পক্ষ বিবাদে জড়িয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে বিব্রত।”
তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, বিরোধটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার আগেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
চিকিৎসাধীন তিনজন
আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় আলমগীর হোসেন আলমের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। তাঁর স্ত্রী মাহবুবা খাতুনের বাম চোখের পাশেও ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে আতিয়ার রহমান সুমনের হাতেও আঘাত রয়েছে। আহত তিনজনকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তবে তাঁদের আঘাতের বিস্তারিত ধরন বা কার আঘাতে কে আহত হয়েছেন, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পুলিশ কী বলছে?

আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান মাসুদ জানান, ছুরিকাঘাতের ঘটনার বিষয়ে তিনি শুনেছেন। তবে ঘটনার বিষয়ে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হতে পারে।
বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ
ফসলি জমি থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে পরিবেশ ও কৃষিজমির ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে কৃষিজমি রক্ষা, বালু উত্তোলনের বৈধতা এবং পরিবহনের কারণে সড়কের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত এবং সেটি বৈধ নাকি অবৈধ—তা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা
একই ঘটনায় দুই পক্ষের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ আসায় প্রকৃত ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এক পক্ষ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ এবং চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগ করছে; অন্য পক্ষ মাদক ব্যবসার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে হামলার পাল্টা দাবি করছে।
এ অবস্থায় লিখিত অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থলের তথ্য যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

