যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস উপকূলে ছয় আরোহী নিয়ে একটি মেডিকেল ফ্লাইট নিখোঁজ হয়েছে। বারমুডা থেকে বোস্টনের উদ্দেশে যাত্রা করা গালফস্ট্রিম জি-১০০ বিমানটির সঙ্গে মাঝ আকাশে হঠাৎ রেডিও ও রাডার—দুই ধরনের যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর আগে বিমানটি প্রায় ২৪ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে দ্রুত নেমে ১১ হাজার ফুটের কাছাকাছি চলে আসে। একই সময়ে পাইলট জরুরি পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন বলে রেডিও যোগাযোগের তথ্য থেকে জানা গেছে।
নিখোঁজ বিমানটির সন্ধানে আকাশ ও সমুদ্রপথে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। ম্যাসাচুসেটসের নানটাকেট দ্বীপের উপকূলবর্তী এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের নর্থইস্ট ডিস্ট্রিক্ট।
বারমুডা থেকে উড্ডয়নের পর নিখোঁজ
বিবিসির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার (৩ অক্টোবর) ভোরে বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। বিমানটি বারমুডার এলএফ ওয়েড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটে উড্ডয়ন করে।
ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির গন্তব্য ছিল বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। স্থানীয় সময় রাত ১টা ৩০ মিনিটে সেখানে অবতরণের কথা ছিল বিমানটির।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে মাঝ আকাশেই বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১টার পরপরই বিমানটির সন্ধানে তল্লাশি ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
২৪ হাজার ফুট থেকে দ্রুত নেমে আসে বিমান
নিখোঁজ হওয়ার আগে বিমানটির গতিপথে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের ট্র্যাকার তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ৭ হাজার ৩০০ মিটার বা ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল।
এরপর কোনো এক পর্যায়ে বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মিটার বা ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় চলে আসে। এই দ্রুত উচ্চতা পরিবর্তনের পরই বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে ঠিক কী কারণে বিমানটি এত দ্রুত নিচে নেমে এসেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
পাইলট জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছিলেন
নিখোঁজ হওয়ার আগে বিমানটির পাইলট এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের মধ্যে যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছিল বলে লাইভএটিসি ডটনেট থেকে পাওয়া রেডিও যোগাযোগের তথ্যের বরাত দিয়ে বোস্টন গ্লোব জানিয়েছে।
রেডিও কথোপকথনে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারকে পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে শোনা যায়। কন্ট্রোলার জানতে চান, বিমানটি কোনো নির্দেশনা না পেয়েই এগিয়ে আসছে কি না এবং পাইলট জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করছেন কি না।
পাইলটের জবাব স্পষ্টভাবে শোনা যায়নি। এরপর কন্ট্রোলার বলেন, পাইলটের কথা খুব দুর্বল শোনা যাচ্ছে এবং তিনি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছেন কি না, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে না।
পরে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার নিশ্চিত করেন যে পাইলট জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছিলেন।
‘বৈদ্যুতিক সমস্যা’ দেখা দিয়েছিল
রেডিও যোগাযোগের পর স্থানীয় সময় রাত ১টার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ডিসপ্যাচার জরুরি উদ্ধারকারী দলকে বিমানটির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন।
ডিসপ্যাচারের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটিতে ‘বৈদ্যুতিক সমস্যা’ দেখা দিয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
কিছু সময় পর ডিসপ্যাচার জানান, বিমানটির রেডিও ও রাডার—দুটোরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে বিমানটির সঠিক অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।
বিমানে ছিলেন ছয়জন
বিমানটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ল্যাটিটিউড এয়ার অ্যাম্বুলেন্সেস। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল ফ্লাইট পরিচালনা করে এবং চিকিৎসা শেষে রোগীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কাজে এসব ফ্লাইট ব্যবহার করে।
কোস্টগার্ড প্রকাশিত বিমানের টেইল নম্বরের ভিত্তিতে বিমানটি ল্যাটিটিউড এয়ার অ্যাম্বুলেন্সেসের বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ফ্লাইট অপারেশন্স পরিচালক ক্ল্যারেন্স টোগেরেটজ সিবিসি নিউজকে জানান, বিমানে ছিলেন দুই পাইলট ও দুইজন মেডিকেল কর্মী। তারা সবাই কানাডার নাগরিক।
তিনি জানান, একজন রোগী ও তাঁর স্বজনকে নেওয়ার জন্য বিমানটির ক্রুরা বারমুডায় গিয়েছিলেন। রোগী ও তাঁর স্বজন কানাডার নাগরিক নন।
অর্থাৎ বিমানটিতে মোট ছয়জন আরোহী ছিলেন—চারজন ক্রু এবং একজন রোগী ও তাঁর স্বজন।
নানটাকেট উপকূলে তল্লাশি
বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ম্যাসাচুসেটসের নানটাকেট দ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় অনুসন্ধান জোরদার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের নর্থইস্ট ডিস্ট্রিক্ট জানিয়েছে, বিমানটির সন্ধানে আকাশ ও সমুদ্র—দুই পথেই তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
নিখোঁজ বিমানের সম্ভাব্য গতিপথ, সর্বশেষ রাডার তথ্য এবং শেষবার যোগাযোগের স্থান বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ বিমানটির অবস্থান কিংবা ছয় আরোহীর ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে
বিমানটির হঠাৎ উচ্চতা কমে যাওয়া, বৈদ্যুতিক সমস্যার তথ্য, পাইলটের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা এবং পরে রেডিও ও রাডার—উভয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিমানটি কেন দ্রুত উচ্চতা হারিয়েছিল, বৈদ্যুতিক সমস্যার প্রকৃতি কী ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা কীভাবে একসঙ্গে অচল হয়ে গেল এবং বিমানটি শেষ কোথায় ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া বিমানটির রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড, আবহাওয়া পরিস্থিতি, ফ্লাইট ডেটা, রাডার তথ্য এবং পাইলট-এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের শেষ কথোপকথনও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় দুর্ঘটনার কারণ বা বিমানের পরিণতি সম্পর্কে এখনই কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করেনি কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধার অভিযানের দিকে নজর
মেডিকেল ফ্লাইটটিতে থাকা ছয়জনের মধ্যে দুইজন পাইলট, দুইজন মেডিকেল কর্মী, একজন রোগী এবং একজন স্বজন ছিলেন। তাদের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমুদ্র ও আকাশপথে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
বিমানটির সঙ্গে শেষ যোগাযোগ, সর্বশেষ রাডার অবস্থান এবং সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নিখোঁজ বিমানটির অবস্থান শনাক্ত এবং আরোহীদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

