ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ফেনীতে ১,৫৪২ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পের উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

ফেনীতে ১,৫৪২ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পের উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

ছবিঃ সংগৃহীত

ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের বন্যা ও নদীভাঙনের দুর্ভোগ কমাতে বহুল প্রতীক্ষিত ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এ প্রকল্পের আওতায় নদী ও জলাধার পুনঃখনন, বাঁধ পুনর্বাসন, নদীতীর সংরক্ষণ এবং সেচ অবকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে সড়কপথে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার খেয়াঘাট-মুহুরী ব্রিজ এলাকায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন। ফলক উন্মোচনের পর তিনি সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় খাল খনন কর্মসূচিরও শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

দীর্ঘদিনের বন্যা-ভাঙনের দুর্ভোগ

ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিবছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। বিশেষ করে মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে বিভিন্ন সময়ে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

বন্যার পানিতে স্থানীয় মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কৃষি, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা স্থায়ীভাবে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে মুহুরী-কহুয়া নদী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাঁধ ও সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একনেকে অনুমোদন ১,৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুহুরী-কহুয়া নদী ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কৃষিকাজে সেচ সুবিধা উন্নত করা। একই সঙ্গে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ পুনর্বাসনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৮৩.৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন করা হবে। এর মাধ্যমে নদীর পানি ধারণক্ষমতা ও পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ৬৮ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন করা হবে। নদীতীর সংরক্ষণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সেচ অবকাঠামো সংস্কার ও পুনর্বাসনের কাজও প্রকল্পের আওতায় থাকবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকার পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কমবে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি

প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে নদীর পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো। পাশাপাশি বাঁধ পুনর্বাসন ও নদীতীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীভাঙনের ঝুঁকিও কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে অতিরিক্ত পানি নেমে এলে মুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে বাঁধের ওপর চাপ তৈরি হয়ে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয় এবং পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। পুনর্বাসিত ও শক্তিশালী বাঁধ এবং উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ

বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সেচব্যবস্থার উন্নয়ন। সংশ্লিষ্ট সেচ অবকাঠামো সংস্কারের ফলে কৃষিজমিতে প্রয়োজনীয় সময়ে পানি সরবরাহের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে প্রকল্প এলাকার কৃষি উৎপাদন ও কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা

ঢাকা থেকে সড়কপথে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর ফেনী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান।

এ সময় ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য ভিপি জয়নাল আবেদীন, ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা স্থায়ী সমাধানের

প্রকল্পটির উদ্বোধনকে ঘিরে ফেনীর নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্যা ও ভাঙন থেকে স্থায়ীভাবে রেহাই পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময় ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন এবং বাঁধ ও নদী ব্যবস্থাপনায় টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার বন্যা, নদীভাঙন ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার তীব্রতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সেচব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

জনসমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর

প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন ও উদ্বোধন শেষে স্থানীয় গ্রামবাসীদের আয়োজনে একটি জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক এবং ফেনীর মানুষের দীর্ঘদিনের বন্যা ও নদীভাঙন সমস্যার সমাধানে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরা হবে বলে জানানো হয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!