টেলিভিশনের পর্দায় পরিচিত মুখ থেকে এবার ভয়াবহ মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি—মিশরের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপিকা সারা খলিফাকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। দেশটির একটি আদালত বড় পরিসরের মাদক চোরাচালান ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের মামলায় সারা খলিফাসহ ১২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) কায়রোর ফিফথ সেটেলমেন্ট কোর্ট কমপ্লেক্সে বিচারক প্যানেল মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিদের প্রত্যেককে ৫ লাখ মিশরীয় পাউন্ড জরিমানা এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে মিশরের আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও আপিলের সুযোগ রয়েছে। সারা খলিফার আইনজীবীরাও উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
কী অভিযোগ সারা খলিফার বিরুদ্ধে?
মিশরীয় তদন্তকারী সংস্থা ও প্রসিকিউশনের প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারির পর সারা খলিফাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিদেশ থেকে মাদকের কাঁচামাল মিশরে আনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তদন্তকারীরা প্রায় ৪০ দিন গোপন নজরদারি চালানোর পর ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল কায়রো থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেন।
তদন্তে সারা খলিফার সঙ্গে তার ভাই এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সারা খলিফা আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে মাদক ল্যাবের অভিযোগ
মামলার তদন্তে কায়রোর দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কথিত গোপন মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী, সেখানে ৭৫০ কেজির বেশি রাসায়নিক কাঁচামাল ও তৈরি মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধারের কথাও মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উদ্ধার করা সামগ্রীর প্রকৃতি, মাদক তৈরির প্রক্রিয়া এবং আসামিদের প্রত্যেকের ভূমিকা নিয়ে আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের বিস্তারিত তথ্য সব সূত্রে সমানভাবে পাওয়া যায়নি।
মামলায় আসামি ছিলেন ২৮ জন
সারা খলিফাকে কেন্দ্র করে আলোচিত এই মামলায় মোট ২৮ জন আসামি ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে মামলার পক্ষে একাধিক ধরনের তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ফোন যোগাযোগের তথ্য, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
এ ছাড়া ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ১ লাখ মিশরীয় পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে ৭ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সারা
রায়ের আগে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আদালতে আবেগঘন বক্তব্য দেন সারা খলিফা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি দাবি করেন, তার বাবা-মা তাকে সৎভাবে বড় করেছেন এবং মাদকের অর্থের তার কোনো প্রয়োজন নেই। এমনকি তিনি জীবনে সাধারণ সিগারেটও স্পর্শ করেননি বলে আদালতে দাবি করেন।
তিনি বিচারকের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে প্রাণভিক্ষাও চান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ডিজিটাল ও ভৌত প্রমাণ বিবেচনা করে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
সারা খলিফা কে?
৩৯ বছর বয়সী সারা খলিফা মিশরের বিনোদনজগতের পরিচিত মুখ। টেলিভিশন উপস্থাপনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা রয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মিশরীয় তারকা ফুটবলার মাহমুদ কাহরাবার সাবেক স্ত্রী হিসেবেও তিনি আলোচনায় ছিলেন।
টিভি উপস্থাপনার পাশাপাশি তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও ছিল। কায়রোর আঘৌজা এলাকায় তার একটি কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিক এবং ‘সারা প্রোডাকশন’ নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান থাকার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালে জনপ্রিয় গায়ক হামো বিকার সঙ্গে ‘সারা অ্যান্ড বিকা’ শো করেও আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
আগেও মামলায় জড়ানোর অভিযোগ
সারা খলিফার বিরুদ্ধে এর আগেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে একজন গাড়িচালককে মারধর করে সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ এবং এক যুবককে অপহরণ ও নির্যাতনের মামলার কথা বলা হয়েছে। ওই ঘটনায় তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে বর্তমান মাদক মামলার অভিযোগ ও আগের মামলাগুলোর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয়।
মিশরে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক
সারা খলিফাসহ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় মিশরে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরে মিশরে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সংগঠনটির অবস্থান অনুযায়ী, হত্যা ছাড়া অন্যান্য গুরুতর অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি মানবাধিকার প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে মিশরের আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং আদালত মামলার প্রমাণ ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতেই রায় দিয়ে থাকে।
রায়ের পরও শেষ হয়নি আইনি লড়াই
আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও সারা খলিফার আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। তার আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ফলে চূড়ান্তভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না এবং হলে কখন হবে—তা নির্ভর করবে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
আলোচিত রায়ে নতুন করে প্রশ্ন
একদিকে জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকা, অন্যদিকে ভয়াবহ মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি—সারা খলিফাকে ঘিরে এই দ্বৈত পরিচয়ই ঘটনাটিকে মিশর ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
মামলায় আদালতের রায়ে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন এবং ৭ জনের খালাসের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। এখন নজর থাকবে আপিল ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে।
তথ্যসূত্র: দ্য সানডে গার্ডিয়ান, এনডিটিভি ও দ্য ইজিপ্ট ইন্ডিপেনডেন্ট।

