আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬’ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন বিধিমালায় নির্বাচনি প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মিছিল-শোডাউন, হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহার, সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট প্রচারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সই করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
নতুন আচরণবিধিতে প্রার্থীদের প্রচারণার ধরন, নির্বাচনি ব্যয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার এবং প্রচার-প্রচারণায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে।
পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
নতুন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণবিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো নির্বাচনি প্রচারণায় পোস্টার নিষিদ্ধ করা।
কোনো প্রার্থী নিজে কিংবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। পাশাপাশি ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি স্থাপনা, সেতু, কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এর ফলে প্রচলিত পোস্টারনির্ভর নির্বাচনি প্রচারণার পরিবর্তে প্রার্থীদের অপেক্ষাকৃত নিয়ন্ত্রিত ও বিকল্প প্রচারপদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হবে।
তফসিল ঘোষণার পর মিছিল-শোডাউন নয়
বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ্য মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না।
ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেন কিংবা অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল বা শোডাউন করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারণায় হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ফলে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের বড় ধরনের শোডাউন কিংবা যানবাহননির্ভর প্রচারণার সুযোগ সীমিত থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা করা যাবে
পোস্টার ও প্রকাশ্য মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনি প্রচারণার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে ডিজিটাল প্রচারণা শুরু করার আগে প্রার্থীকে কোন কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে তথ্য দিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হবে, সেটিও নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ ডিজিটাল প্রচারণাকে নির্বাচনি ব্যয়ের বাইরে রাখার কোনো সুযোগ থাকবে না।
এআই দিয়ে অপপ্রচার করলে ব্যবস্থা
নতুন বিধিমালায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নির্বাচনি অপপ্রচার ঠেকাতে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ, ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বা চরিত্রহননমূলক বক্তব্য প্রচার করতে পারবেন না।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী বা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করাও নিষিদ্ধ। এমন কোনো কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করা যাবে না, যা নির্বাচনি পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে কিংবা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সময়ে এ বিধানকে উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নতুন সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টাকা, খাবার ও উপহার দিয়ে ভোটার প্রভাবিত করা যাবে না
ভোটারদের প্রভাবিত করতে অর্থ, খাদ্য, পানীয় বা উপহার দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রার্থী বা তার সমর্থকেরা ভোটারদের কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ভোট নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারবেন না। একইভাবে পেশিশক্তি প্রয়োগ কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়েও ভোটারদের প্রভাবিত করা যাবে না।
নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব কমিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই এ ধরনের বিধান রাখা হয়েছে।
ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণা নিষিদ্ধ
ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না।
ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়া কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো প্রার্থী বা প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণা চালানোর সুযোগও থাকবে না।
একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন কিংবা অপমানজনক প্রচারণা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
সরকারি সুবিধা ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনি প্রচারণায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
কোনো প্রার্থী সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বা অন্য কোনো সরকারি সম্পদ নির্বাচনি কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে।
এর উদ্দেশ্য হলো সরকারি প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করে কোনো প্রার্থী যেন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা নিতে না পারেন।
ভোটের দিন ভোটার আনা-নেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনের দিন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন ভাড়া করা বা ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে না।
এ ছাড়া নির্বাচনি প্রচারণায় ক্যাম্প স্থাপন ও মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিমালায় নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। প্রচারণার নামে অতিরিক্ত শব্দদূষণ, জনদুর্ভোগ কিংবা নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্নিত করার সুযোগ থাকবে না।
প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে ইসি
নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাও আরও স্পষ্ট ও জোরদার করা হয়েছে।
কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন কিংবা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন বলে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে ইসি।
অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া যেতে পারে।
নির্বাচনি ব্যয়সীমা অতিক্রম, অর্থ বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোর মতো কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিধিমালা ভঙ্গের দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ফলে নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নির্বাচনি প্রচারণায় প্রতিটি পদক্ষেপ আরও সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে।
বদলে যেতে পারে উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণার ধরন
নতুন আচরণবিধির কারণে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রচারণার প্রচলিত ধরনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পোস্টার, মিছিল ও যানবাহননির্ভর শোডাউনের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনুমোদিত প্রচারপদ্ধতির ওপর প্রার্থীদের বেশি নির্ভর করতে হবে।
বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ থাকায় ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রেও প্রার্থীদের সতর্ক থাকতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা, নতুন আচরণবিধি নির্বাচনি ব্যয়ে শৃঙ্খলা, প্রচারণায় সমতা এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে অর্থ, পেশিশক্তি, সরকারি প্রভাব ও প্রযুক্তির অপব্যবহার কমিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে আরও অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করার ক্ষেত্রে বিধিমালাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

