আর মাত্র পাঁচ দিন পর শেষ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বর্তমান কমিটির মেয়াদ। নিয়ম অনুযায়ী আগামী সপ্তাহের শুরুতেই পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রত্যাশা থাকলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে অনিশ্চয়তা।
ডাকসুর বর্তমান নেতারা অবশ্য বলছেন, কোনো ধরনের বিলম্ব বা টালবাহানা মেনে নেওয়া হবে না। মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমান কমিটি দায়িত্ব দীর্ঘায়িত করতে চায় না। তাদের দাবি, নির্ধারিত সময়েই বর্তমান কমিটির দায়িত্ব শেষ করে দ্রুত পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। হলগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা, প্রাধ্যক্ষদের কাছ থেকে প্রতিবেদন নেওয়া এবং ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা—সবকিছু বিবেচনা করে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হবে।
ডাকসুর বর্তমান কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে ডাকসু সংবিধান অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও এখনো নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা তফসিল ঘোষণা হয়নি।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কি পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে, নাকি নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হবে?
কারও কারও আশঙ্কা, প্রশাসনিক জটিলতা, ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের মতপার্থক্যের কারণে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। আবার অন্য একটি পক্ষ মনে করছে, ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে প্রশাসনিকভাবে বাড়তি প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সময় নিতে পারে।
মেয়াদ তিন মাস বাড়ানোর সুযোগ, তবে রাজি নয় বর্তমান কমিটি
ডাকসুর সংবিধানে তফসিল ঘোষণায় বিলম্ব হলে বর্তমান কমিটির মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন মাস বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাকসুর নেতারা। তবে বর্তমান কমিটি সেই সুযোগ নিতে আগ্রহী নয়।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, তারা কোনোভাবেই মেয়াদ বাড়াতে চান না। বরং আগামী ১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব শেষ করে ওই দিনই পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রত্যাশা করছেন।
তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কোনো টালবাহানা চলবে না। আমরা ইসি মিটিংয়ে বলেছি, সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখ আমরা মেয়াদ শেষ করতে চাই।’
জিএসের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান কমিটির দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংবিধানে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তারা এক ঘণ্টার জন্যও মেয়াদ বাড়াতে চান না।
‘যেকোনো মূল্যে নির্বাচন আদায় করব’
বর্তমান ডাকসু নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দাবি হলো নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করা। জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, তারা শুধু পরবর্তী নির্বাচন আয়োজন নয়, ভবিষ্যতে যেন প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে চান।
তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে তারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচন আদায় করে নিতে চান।
ডাকসু নেতৃত্বের এমন অবস্থানের পেছনে মূল যুক্তি হলো—নির্বাচিত ছাত্র সংসদে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। তাদের মতে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে আবারও দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা থাকবে।
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার আরেকটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে অর্থের বিষয়টি। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। তবে চলতি সময়ে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে আলাদা কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ডাকসুর নেতারা। তাদের মতে, নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা আগে থেকেই জানা থাকলে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখা উচিত ছিল।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, বাজেটে আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এর ব্যয় ঘাটতি বাজেট থেকে মেটানো হবে।
তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের জন্য কোনো বাজেট রাখা হয়নি। যদি নির্বাচন হয়, সেটা ঘাটতি বাজেট থেকে হবে।’
অর্থাৎ বাজেটে আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও অর্থ সংকটকে নির্বাচন আয়োজনের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, নির্বাচনের অর্থায়ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে আবেদন করে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে পারে বলেও তিনি জানান।
তার মতে, শুধু বাজেটে অর্থ না থাকার কারণে ডাকসু নির্বাচন আটকে থাকা উচিত নয়। নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
প্রশাসন বলছে, প্রস্তুতি শুরু হয়েছে
নির্বাচন নিয়ে দৃশ্যমান প্রস্তুতি নেই—এমন অভিযোগের বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বর্তমান ডাকসু কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি জানান, হলগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাধ্যক্ষদের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে হবে আলোচনা
ডাকসু নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গেও আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর ভাষ্য, ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী চায় এবং ডাকসুর কাঠামো বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো বিষয় যুক্ত করার প্রয়োজন আছে কি না—এসব নিয়ে তাদের মতামত নেওয়া হবে।
এরপর সব পক্ষের মতামত, হলগুলোর পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি বিবেচনা করে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করা হবে।
তবে ঠিক কবে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে—এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২৯ বছরের অপেক্ষার পর নিয়মিত নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তা ছিল। ২০১৯ সালের আগে সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। অর্থাৎ দুই নির্বাচনের মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় ২৯ বছর।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তী নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এ কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন নিয়মিত নির্বাচনের ধারাবাহিকতা দেখতে চায়। তাদের প্রত্যাশা, একবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আবার যেন দীর্ঘ বিরতি না আসে।
সামনে এখন কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে মূলত তিনটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কি তফসিল ঘোষণা হবে, নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি কতটা সম্পন্ন হয়েছে এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করে কবে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি জানালেও প্রশাসন বলছে, প্রস্তুতি চলছে এবং সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হবে।
ফলে আগামী কয়েক দিনই ডাকসু নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যদি তফসিল ঘোষণা করা হয়, তাহলে নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পথে তা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। আর তফসিল ঘোষণায় বিলম্ব হলে নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

