যশোরের মণিরামপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা, অবকাঠামোগত সমস্যা ও ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতার চিত্র ফের সামনে এসেছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে। উপজেলার সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার কোনো পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে অংশ নেওয়া মোট ৪১ পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।
শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং পাঁচটি দাখিল মাদরাসা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া-সমসকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, নেংগুড়াহাট মহিলা দাখিল মাদরাসা, পাড়দিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসা, শ্যামকুড় যমযমিয়া দাখিল মাদরাসা, নেহালপুর দাখিল মাদরাসা ও ইত্যা স্লুইসগেট দাখিল মাদরাসা।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা ভবন রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু সেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ জনেরও কম। শিক্ষক রয়েছেন নয়জন। এমনকি চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে অংশ নেওয়া একমাত্র পরীক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।
কোটি টাকার ভবন, শিক্ষার্থী ৩০-এরও কম
সরেজমিন ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ে একসময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকলেও বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অথচ বিদ্যালয়ের জন্য নির্মিত হয়েছে বড় পরিসরের চারতলা ভবন।
এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে উর্মি মণ্ডল নামে মাত্র একজন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় তার ফলও পাসের তালিকায় ওঠেনি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, “এবার আমাদের নিয়মিত কোনো এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল না। উর্মি মণ্ডল নামে এক শিক্ষার্থীর আগে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন করা ছিল। গত বছর পরীক্ষা দেয়নি। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে গণিতে ফেল করেছে।”
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক গণিত পড়াতেন। প্রায় আট-নয় মাস আগে তিনি চলে যাওয়ার পর আর গণিতের শিক্ষক আসেননি। করোনার পর থেকেই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
সাত প্রতিষ্ঠানে ৪১ পরীক্ষার্থী, পাস শূন্য
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সাতটি প্রতিষ্ঠানের মোট ৪১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। কিন্তু তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
এর মধ্যে হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয় থেকে একজন, চান্দুয়া-সমসকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে তিনজন, নেংগুড়াহাট মহিলা দাখিল মাদরাসা থেকে ১৭ জন, পাড়দিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসা থেকে চারজন, শ্যামকুড় যমযমিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে ছয়জন, নেহালপুর দাখিল মাদরাসা থেকে ছয়জন এবং ইত্যা স্লুইসগেট দাখিল মাদরাসা থেকে চারজন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়।
ফলাফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কম, কোথাও নেই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী
চান্দুয়া-সমসকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে পাশের চারটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র ১৬ জন শিক্ষার্থীকে ক্লাস করতে দেখা যায়।
এর মধ্যে দশম শ্রেণিতে একজন, অষ্টম শ্রেণিতে একজন, সপ্তম শ্রেণিতে চারজন এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১০ জন শিক্ষার্থী ছিল। নবম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত বালা বলেন, “এবার আমাদের বিদ্যালয় থেকে তিনজন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। তাদের একজন নিয়মিত এবং দুজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী। কেউই পাস করতে পারেনি।”
তার দাবি, বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষক-কর্মচারীর সংকট না থাকলেও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, বছরের বেশিরভাগ সময় বিদ্যালয়ের মাঠে পানি জমে থাকে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষেও পানি ঢুকে পড়ে। ফলে অভিভাবকেরা সন্তানদের এ বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এমপিও না থাকায় বেতন পান না কয়েক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক
মণিরামপুরের শতভাগ অকৃতকার্য সাত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি দাখিল মাদরাসা এমপিওভুক্ত নয়। ইত্যা স্লুইসগেট, পাড়দিয়া ও নেহালপুর দাখিল মাদরাসার শিক্ষকরা সরকারি বেতন-ভাতা পান না।
নেহালপুর দাখিল মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, “আমাদের ছয়জন ছেলে পরীক্ষা দিয়েছিল। কেউ পাস করতে পারেনি। আমরা বেতন পাই না। এ কারণে শিক্ষকরাও নিয়মিত ক্লাস নিতে আগ্রহী হন না।”
এ অবস্থায় শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতি—দুই দিক থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দায় কার—অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট নাকি শিক্ষার্থী সংকট?
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন নিয়মিত পাঠদান, যোগ্য ও পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যকর একাডেমিক পরিকল্পনা।
মণিরামপুরের সাত প্রতিষ্ঠানের ফলাফল সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে—কোথাও কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণের পরও কেন শিক্ষার্থী নেই, আবার কোথাও শিক্ষক ও কর্মচারী পর্যাপ্ত থাকার পরও কেন এসএসসি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারছে না।
বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা, অবকাঠামো ব্যবহার, শিক্ষক-কর্মচারীর উপস্থিতি, পাঠদানের মান এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ নিয়ে কার্যকর মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শিক্ষা কর্মকর্তার
মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুজাফফার হোসেন বলেন, শতভাগ অকৃতকার্য সাত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি মাদরাসা এমপিওভুক্ত নয়। বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, অবকাঠামোর ব্যবহার এবং নিয়মিত পাঠদানের বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

