বিশাল আয়তনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দৈনন্দিন চলাচলের অন্যতম ভরসা অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা। তবে প্যাডেলচালিত রিকশা, ইলেকট্রিক কার্ট ও অটোরিকশা চালু থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—পরিবহন ব্যবস্থায় নেই শৃঙ্খলা, নেই পর্যাপ্ত যানবাহন, আর অতিরিক্ত ভাড়া ও চালকদের স্বেচ্ছাচারিতায় প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে একাডেমিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, প্রশাসনিক ভবন, গবেষণাগার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দূরত্ব অনেক বেশি। ফলে প্রতিদিনের ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা, লাইব্রেরি ব্যবহার কিংবা প্রশাসনিক কাজের জন্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অভ্যন্তরীণ পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত যানবাহন না পাওয়া, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা না থাকা এবং চালকদের অনিয়মের কারণে তাদের চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাস শুরু ও শেষ হওয়ার সময় পরিবহন সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। এ সময় অনেক রিকশা ও অটোরিকশাচালক শিক্ষার্থীদের তুলতে অনীহা প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া পাওয়া যায় বলে অনেক চালক ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের এড়িয়ে চলেন। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও যানবাহন পাওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, বহিরাগত যাত্রীদের জন্য অধিকাংশ রিকশা ও অটোরিকশা ডেইরি গেট, প্রান্তিক ও ইসলামনগর এলাকায় অবস্থান করে। ফলে ক্যাম্পাসের ভেতরের বিভিন্ন রুটে শিক্ষার্থীদের জন্য যানবাহনের সংকট তৈরি হয়।

একই বিভাগের শিক্ষার্থী সিহাব আহমেদ বলেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের হলসংলগ্ন এলাকায় প্রয়োজনের সময় রিকশা বা অটোরিকশা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ইলেকট্রিক কার্টও সীমিত রুটে চলাচল করায় অনেক সময় দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হয়। প্যাডেল রিকশার সংখ্যাও আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একটি অটোরিকশা বা রিকশা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে ক্লাস ও পরীক্ষায় দেরি হয়ে যায়। অনেক চালক অল্প দূরত্বের জন্যও ২০ টাকা বা তার বেশি ভাড়া দাবি করেন, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ইলেকট্রিক কার্ট নির্দিষ্ট কয়েকটি রুটেই সীমাবদ্ধ থাকায় পুরো ক্যাম্পাসে সমানভাবে সেবা পাওয়া যায় না। ফলে একদিকে কার্ট চললেও অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলসংলগ্ন এলাকায় এই সংকট বেশি প্রকট।

পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে—সব রুটে পর্যাপ্ত অটোরিকশা ও ইলেকট্রিক কার্ট চালু করা, প্যাডেল রিকশা ও অটোরিকশার জন্য নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রণয়ন ও কার্যকর করা, চালকদের নিবন্ধনের আওতায় এনে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু)-এর পরিবহন সম্পাদক তানভীর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত অটোরিকশা চালু এবং নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিষয়গুলো এতদিন বাস্তবায়ন হয়নি। তবে খুব শিগগিরই আরও ৫০টি অটোরিকশা চালুর অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ক্যাম্পাসে চলাচলকারী সব অটোরিকশা ও প্যাডেলচালিত রিকশায় নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টানিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি জাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসের সব পরিবহনে লাইভ ট্র্যাকার (GPS Tracking System) সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে যানবাহনের অবস্থান সহজেই জানা যায় এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। জাকসু ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে খুব দ্রুত পর্যাপ্ত পরিবহন নিশ্চিত করা, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা কার্যকর করা এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে শুধু নতুন যানবাহন সংযোজনই নয়, বরং কার্যকর তদারকি, নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। অন্যথায় অভ্যন্তরীণ পরিবহন সংকট ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের প্রধান কারণ হয়ে থাকবে।

