মিটার স্থাপন হয়নি, বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়নি—এরপরও গ্রাহকের নামে এসেছে ৬৯২ টাকার বিদ্যুৎ বিল। জামালপুরের মাদারগঞ্জে এমন ঘটনায় বিস্ময় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। যে মিটারের নামে বিলটি তৈরি করা হয়েছে, সেটি এখনো গ্রাহকের বাড়িতে স্থাপনই করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া বাজার এলাকায়। ভুক্তভোগী গ্রাহক নিমাই চন্দ্র সরকারের বাড়িতে আগে থেকেই দুটি আবাসিক ও দুটি বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। এর বাইরে তিনি আরও একটি নতুন মিটারের জন্য আবেদন করেন। তবে নতুন মিটার স্থাপন ও সংযোগ দেওয়ার আগেই ওই মিটারের বিপরীতে আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ বিল তৈরি হয়েছে।
মিটার বসেনি, সংযোগও দেওয়া হয়নি
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে তেঘরিয়া বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিমাই চন্দ্র সরকারের বাড়িতে নতুন মিটার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়্যারিং বোর্ড তৈরি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেখানে নতুন কোনো বিদ্যুৎ মিটার স্থাপন করা হয়নি। একইভাবে নতুন মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগও চালু করা হয়নি।
অর্থাৎ, নতুন মিটারের আওতায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করার সুযোগই তৈরি হয়নি। এর মধ্যেই আগস্ট মাসের জন্য ৬৯২ টাকা বিল আসায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, মিটারই যেখানে স্থাপন করা হয়নি এবং সংযোগ চালু হয়নি, সেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব তৈরি হলো কীভাবে? বিল তৈরির আগে মিটার রিডিং নেওয়া হয়েছিল কি না, কিংবা কোনো সফটওয়্যার বা তথ্যপ্রক্রিয়াজনিত ত্রুটির কারণে বিল তৈরি হয়েছে কি না—তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
অভিযোগ কেন্দ্রের কর্মকর্তার বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে তেঘরিয়া অভিযোগ কেন্দ্রের ইনচার্জ মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, নিমাই চন্দ্র সরকারের সঙ্গে কথা বলেই বিল করা হয়েছে।
তবে মিটার স্থাপন বা বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলেও কীভাবে ওই মিটারের নামে বিল তৈরি করা হলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরে বিষয়টিকে ‘ভুল’ হিসেবে স্বীকার করেন।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলার ভিত্তিতে যদি বিল তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে মিটার না থাকা অবস্থায় ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো কীভাবে। এ ধরনের বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো নিয়ম বা সফটওয়্যারভিত্তিক ত্রুটি রয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
‘সফটওয়্যার পরিবর্তনের কারণে সমস্যা’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) আবু সালেহ মো. নাঈমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সফটওয়্যার পরিবর্তনের কারণে এমন সমস্যা হয়ে থাকতে পারে বলে দাবি করেন।
তবে মিটার স্থাপন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হওয়ার আগেই কীভাবে ওই গ্রাহকের নামে ৬৯২ টাকার বিল তৈরি হলো—এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
তার বক্তব্যে সফটওয়্যার পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এলেও ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় নতুন মিটারের তথ্য সিস্টেমে প্রবেশ করেছে এবং কীভাবে বিলিং সম্পন্ন হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়নি।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছেও নেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা
একই বিষয়ে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) সৈয়দা ফারজানা ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও মিটার বা সংযোগ ছাড়া কীভাবে বিল এসেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
তিনি জানান, মিটার বা সংযোগ না থাকা অবস্থায় কীভাবে ওই বিল তৈরি হয়েছে, বিষয়টি তার জানা নেই।
জবাবদিহি ও বিলিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
বিদ্যুৎ বিল সাধারণত মিটারভিত্তিক ব্যবহারের তথ্যের ওপর নির্ভর করে তৈরি হওয়ার কথা। ফলে কোনো মিটার স্থাপনের আগেই সেই মিটারের নামে বিল তৈরি হওয়ার ঘটনায় গ্রাহকসেবা ও বিলিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে মিটার স্থাপন, সংযোগ চালু, মিটার নম্বর ও গ্রাহকের তথ্য সঠিকভাবে সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এরপর বিলিং কার্যক্রম শুরু করার প্রক্রিয়ায় কোথাও ত্রুটি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী গ্রাহকের দাবি, তিনি নতুন মিটারের জন্য আবেদন করলেও এখনো মিটার হাতে পাননি কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু করেননি। তারপরও ৬৯২ টাকার বিল পাওয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
এ ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে ভুল বিলটি সংশোধন এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মিটার স্থাপনের আগেই বিল তৈরির ঘটনায় সফটওয়্যারজনিত ত্রুটি, তথ্য এন্ট্রির ভুল নাকি অন্য কোনো প্রক্রিয়াগত কারণে এমনটি হয়েছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই পরিষ্কার হবে। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেই কোনো গ্রাহকের নামে বিল তৈরি হলে তা দ্রুত যাচাই ও সংশোধন করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।

