নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কারণ এবং পুনরায় চালুর সম্ভাবনা জানতে চাইলে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলাম মো. আজমের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও প্রকাশ্যে মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে নওগাঁর কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
জানা গেছে, রোববার (১৯ জুলাই) দুপুর দেড়টার দিকে যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার ও নওগাঁ জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শফিক ছোটন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে যান।
তিনি উপপরিচালক গোলাম মো. আজমের কাছে জানতে চান, কেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে এবং কবে নাগাদ এটি পুনরায় চালু হতে পারে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উপপরিচালক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং সাংবাদিক ও তার ভিডিও জার্নালিস্টের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একপর্যায়ে তিনি উচ্চস্বরে কথা বলেন এবং পরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার হুমকিও দেন।
অন্যান্য সাংবাদিকদের সামনেও মামলার হুমকি
ঘটনার খবর পেয়ে নওগাঁয় কর্মরত বিভিন্ন টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে যান।
সেখানে এনটিভির সিনিয়র রিপোর্টার আসাদুর রহমান জয়, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের হারুন অর রশিদ চৌধুরী, স্টার নিউজের তৌহিদ ইসলাম, বৈশাখী টেলিভিশনের আরমান হোসেন রুমন, ডিবিসি নিউজের এ কে সাজু, চ্যানেল নাইনের রিফাত হোসেন সবুজ, এশিয়ান টিভির রাশেদুজ্জামানসহ ১০ থেকে ১২ জন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনেই অন-ক্যামেরায় গোলাম মো. আজম পুনরায় যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক ও ক্যামেরাপার্সনের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেন।
সাংবাদিকদের ক্ষোভ
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বৈশাখী টেলিভিশনের সাংবাদিক আরমান হোসেন রুমন বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে একজন সরকারি কর্মকর্তা যেভাবে সাংবাদিকের সঙ্গে আচরণ করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, "একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও তার আচরণ সন্ত্রাসীদের মতো মনে হয়েছে। জনগণের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তিনি সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন।"
শফিক ছোটনের বক্তব্য
যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার শফিক ছোটন বলেন, হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, "প্রত্যন্ত ওই অঞ্চলের হাজারো মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কবে চালু হবে—এই প্রশ্ন করতেই উপপরিচালক আমার সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। আমাদের ভিডিও জার্নালিস্টকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরে অন্য সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে সবার সামনেই আমাকে মামলার হুমকি দেন।"
সাংবাদিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
এনটিভির সিনিয়র রিপোর্টার ও নওগাঁ জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুর রহমান জয় বলেন,
"ঘটনার খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই। একজন সরকারি কর্মকর্তা যেভাবে প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। নিজের ক্ষোভ সাংবাদিকদের ওপর ঝেড়েছেন বলে মনে হয়েছে।"
অন্যদিকে নওগাঁ জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফরিদুল করিম বলেন,
"জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের সাংবিধানিক ও পেশাগত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানো স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। প্রয়োজনে আন্দোলনের কর্মসূচিও দেওয়া হবে।"
দুই বছর ধরে বন্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্র
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রটি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে।
এর ফলে ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্করা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালু করা না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
যা বললেন উপপরিচালক
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলাম মো. আজম বলেন,
"অনুমতি ছাড়াই ক্যামেরা বের করা হয়েছিল। সে কারণে একটু উচ্চস্বরে কথা বলেছি। তবে মারমুখী আচরণ করিনি। ক্যামেরায় কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে।"
তবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেননি।
তিনি বলেন,
"আজই (রোববার) যমুনা টিভির সাংবাদিক ও ক্যামেরাপার্সনের বিরুদ্ধে নওগাঁ সদর থানায় মামলা করব।"
এখনও হয়নি মামলা
তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক বা ক্যামেরাপার্সনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।
সোমবার (২০ জুলাই) সকালে নওগাঁ সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রদীপ ব্যানার্জী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন,
"এ পর্যন্ত ওই বিষয়ে কোনো মামলার আবেদন বা অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি।"
এ ঘটনায় নওগাঁর সাংবাদিক সমাজের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

