ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, বদলি ও কর সুবিধা—কক্সবাজারের উপকর কমিশনার নুরুল ইসলামকে ঘিরে যত প্রশ্ন

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, বদলি ও কর সুবিধা—কক্সবাজারের উপকর কমিশনার নুরুল ইসলামকে ঘিরে যত প্রশ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের মে মাসে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও আন্দোলন শুরু হয়। ১২ মে জারি করা অধ্যাদেশের পর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে এনবিআরের ২৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি তালিকা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে তালিকাভুক্তদের মধ্যে ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—আন্দোলনের অন্যতম নেপথ্য সমন্বয়কারী হিসেবে যার নাম বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে, সেই উপকর কমিশনার নুরুল ইসলাম খান কেন ওই তালিকায় নেই?

বর্তমানে নুরুল ইসলাম খান কক্সবাজার কর অঞ্চলের কর সার্কেল-০২-এর উপকর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি কর সার্কেল-০৬-এর অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

আন্দোলনে ভূমিকা, অথচ তালিকায় নাম নেই কেন?

অভিযোগকারীদের দাবি, এনবিআর সংস্কারবিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত ও সক্রিয় রাখতে নুরুল ইসলাম খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি আন্দোলনের পেছনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে এই অর্থ ব্যয়ের দাবির পক্ষে প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি সত্য কি না, তা নির্ধারণে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়, তখন নুরুল ইসলাম খান পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি ও সুবিধাজনক বদলির মাধ্যমে তিনি ঢাকার বাইরে চলে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

৩৬ কর্মকর্তা বরখাস্ত, পাঁচজন অবসরে—তবু বহাল নুরুল ইসলাম

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায় ৩৬ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত, পাঁচ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাকে বদলি করার তথ্য আলোচনায় আসে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে, আন্দোলনে যাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের তুলনায় নুরুল ইসলাম খানের ভূমিকা কী ছিল এবং তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছিল কি না।

যদি তিনি আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকে থাকেন, তাহলে তার বিষয়ে তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্নের উত্তরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সাবেক চেয়ারম্যানকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ

নুরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানকে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে তিনি সুবিধাজনক স্থানে বদলি হয়ে কক্সবাজারে পোস্টিং নিয়েছেন।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য বা নথি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, বদলি-পদায়নের সরকারি আদেশ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করলেই কেবল অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

ঢাকায় বিপুল সম্পদের অভিযোগ

নুরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে তার সরকারি আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর আফতাবনগরে তার দুটি প্লট এবং বনশ্রীতে প্রায় সাত শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি ছয়তলা বাড়ি রয়েছে। এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা ও তার নিজ জেলা নেত্রকোণায় আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগের মোট পরিমাণ বিবেচনায় বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য ভূমি রেকর্ড, দলিল, নামজারি, কর নথি, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা কোম্পানি বা ব্যবসায়িক স্বার্থ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বনশ্রীর ‘কামাল’কে ঘিরে নতুন অভিযোগ

অভিযোগের আরেকটি অংশে বনশ্রী এলাকার কামাল নামের এক ব্যক্তির কথা উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিজেকে দক্ষিণ বনশ্রী প্লট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং বনশ্রী এলাকার আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে পরিচয় দিতেন।

তার বনশ্রী এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করছেন, কামাল ও নুরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে কর নির্ধারণে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে কামালকে কর ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্ত বা আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সম্পদ, কর নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাই ছাড়া অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

‘কম কর নির্ধারণের’ অভিযোগও তদন্তের দাবি

নুরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে কামালসহ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে কর নির্ধারণে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট করদাতাদের মূল্যায়ন ফাইল, আয়-ব্যয়ের হিসাব, অডিট আপত্তি, কর নির্ধারণের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী তথ্য এবং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।

একই ধরনের ব্যবসা বা সম্পদের ক্ষেত্রে অন্যান্য করদাতার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম কর নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না—তাও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বের করা সম্ভব।

কক্সবাজারে বর্তমান পদায়ন ঘিরেও প্রশ্ন

অভিযোগের মধ্যেই নুরুল ইসলাম খানের কক্সবাজারে বর্তমান পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ঢাকাকেন্দ্রিক দায়িত্বের পর তিনি অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক স্থানে বদলি হয়েছেন।

তবে সরকারি কর্মকর্তার বদলি বা পদায়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তাই শুধু বদলির তথ্যের ভিত্তিতে অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং বদলির প্রস্তাব, নথি, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা তদন্ত চলছিল কি না—এসব যাচাই করা প্রয়োজন।

নুরুল ইসলাম খান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন। টেলিফোনে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করলেও সম্পদের তথ্য, আন্দোলনে অর্থ ব্যয় এবং বদলি-পদায়ন সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

তার বক্তব্যের পাশাপাশি অভিযোগকারীদের দাবির পক্ষে থাকা নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রেকর্ড যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র

নুরুল ইসলাম খানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দুদক, এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পৃথক ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে—

তার সম্পদ বিবরণী ও আয়কর রিটার্নের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের তুলনা;
আফতাবনগর ও বনশ্রীর জমি-ভবনের মালিকানা ও ক্রয়মূল্য যাচাই;
ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা;
আন্দোলনে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগের আর্থিক উৎস অনুসন্ধান;
বদলি ও পদায়নের সরকারি নথি পর্যালোচনা;
সংশ্লিষ্ট করদাতাদের কর নির্ধারণের ফাইল অডিট;
আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক তদন্তে তার ভূমিকা যাচাই—

এসব করা গেলে অভিযোগগুলোর সত্যতা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

এখন মূল প্রশ্ন, এনবিআর সংস্কারবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় ২৬ জনের তালিকা দুদকে গেলেও নুরুল ইসলাম খানের নাম কেন নেই—তিনি অভিযোগের বাইরে থাকার মতো কোনো ব্যাখ্যা বা প্রমাণ দিয়েছেন কি না। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিপুল সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সত্য হলে সেগুলোর উৎস কী—তাও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!