প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে এবার উৎপাদক, আমদানিকারক, ব্র্যান্ড মালিক ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর সরাসরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় চাপিয়েছে সরকার। নতুন নির্দেশিকার আওতায় নিজেদের বাজারজাত করা প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার শেষে সৃষ্ট বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনঃচক্রায়ন ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে।
‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব বিষয়ক নির্দেশিকা, ২০২৬’-এ এ বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ১২ আগস্ট নির্দেশিকাটির প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্লাস্টিক পণ্যের পুরো জীবনচক্র—উৎপাদন থেকে ব্যবহার এবং ব্যবহার-পরবর্তী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—নিয়ন্ত্রণে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম দুই বছরে ১৫ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ বাধ্যতামূলক
নির্দেশিকা অনুযায়ী, কার্যকর হওয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে তালিকাভুক্ত প্লাস্টিক পণ্যের মোট বর্জ্যের অন্তত ১৫ শতাংশ সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে ন্যূনতম ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন করতে হবে।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরে এই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানো হয়েছে। তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অন্তত ৩০ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ এবং ১৫ শতাংশ পুনঃচক্রায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে যে বর্জ্য সংগ্রহ করে, তা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অংশ হিসেবে গণনা করা যাবে না। অর্থাৎ কোম্পানিকে নিজস্ব উদ্যোগে বা অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত বর্জ্য সংগ্রহ করতে হবে।
একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যের নির্ধারিত প্রতিটি শ্রেণি থেকে সমহারে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু সহজে সংগ্রহযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সুযোগ পাবে না।
কারা ‘অবলাইজড এনটিটি’
নির্দেশিকায় প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, ব্র্যান্ড মালিক এবং খুচরা বিক্রেতাকে ‘অবলাইজড এনটিটি’ বা তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের পণ্য ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করবে। নির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তৃতীয় বছরে মাঝারি এবং পঞ্চম বছরে ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত করা হবে।
তালিকাভুক্ত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধন করতে হবে। নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান বা তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যেই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে।
নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মপরিকল্পনাও জমা দিতে হবে। আবেদন সঠিক থাকলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে তিন বছর।
নিজেরা অথবা PRO-এর মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
অবলাইজড এনটিটি চাইলে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়ন করতে পারবে। আবার অনুমোদিত ‘প্রোডিউসার রেসপনসিবিলিটি অর্গানাইজেশন’ বা PRO-এর মাধ্যমেও এই দায়িত্ব পালন করা যাবে।
PRO-কে পরিবেশ অধিদপ্তরে আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত হতে হবে। এর তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে দুই বছর।
একটি PRO-এর বর্জ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বাছাই, পুনঃচক্রায়ন ও পরিত্যাজনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চ্যানেল, জনসচেতনতা তৈরির কর্মসূচি এবং স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য ডাটাবেজ পরিচালনার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ প্লাস্টিক বর্জ্য
নির্দেশিকায় প্লাস্টিক পণ্য ও বর্জ্যকে পাঁচটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. কঠিন প্লাস্টিক
২. নমনীয় প্লাস্টিক
৩. স্টাইরোফোম ও এক্সপান্ডেড পলিস্টেরিন (EPS)
৪. সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ নয় এমন সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক
৫. অন্যান্য প্লাস্টিক
কঠিন প্লাস্টিকের মধ্যে পানীয় ও পানির বোতল, প্লাস্টিকের কৌটা, খাদ্য সংরক্ষণের কনটেইনার, ডিমের ট্রে, একবার ব্যবহারযোগ্য কাটলারি, PVC পাইপ, ক্যাপ ও ঢাকনা রয়েছে।
নমনীয় প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক ফিল্ম, মোড়ক, মিনিপ্যাক, ল্যামিনেটস ও বহুস্তরীয় প্লাস্টিক। অন্যদিকে স্টাইরোফোম ও EPS-এর কাপ, কনটেইনার, ডিমের কার্টন এবং একবার ব্যবহারযোগ্য কাটলারিও এর আওতায় পড়বে।
এ ছাড়া সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপার, সিগারেট ফিল্টার, ফোম, মাছ ধরার জাল এবং অক্সো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকও নির্দেশিকার আওতায় রাখা হয়েছে।
বেশি বর্জ্য সংগ্রহ করলে মিলবে ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট’
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়ন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সেই অতিরিক্ত অর্জনের বিপরীতে ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট’ পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এই ক্রেডিট পরবর্তী দুই অর্থবছরের মধ্যে অন্য কোনো অবলাইজড এনটিটির কাছে অথবা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যাবে।
অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্জন করতে পারলে ঘাটতি পূরণের জন্য একই শ্রেণির বর্জ্যের প্রকৃত প্লাস্টিক ক্রেডিট অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারবে।
এতে একদিকে অতিরিক্ত বর্জ্য সংগ্রহে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হবে, অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে এনে জবাবদিহির আওতায় রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
ডিপোজিট রিফান্ড ও বাইব্যাক স্কিম
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অবলাইজড এনটিটিগুলো ডিপোজিট রিফান্ড, বাইব্যাক ও টেকব্যাক স্কিম চালু করতে পারবে।
ডিপোজিট রিফান্ড ব্যবস্থায় ভোক্তা বা বর্জ্য ফেরতদাতা নির্দিষ্ট সংগ্রহ কেন্দ্রে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য জমা দিলে তার বিনিময়ে নির্ধারিত অর্থ ফেরত পাবেন। ফলে ব্যবহারের পর প্লাস্টিক পণ্য সরাসরি রাস্তাঘাট, খাল, নদী বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে না দিয়ে ফেরত দেওয়ার জন্য ভোক্তাদের আর্থিকভাবে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
PRO-এর দায়িত্বও নির্ধারণ
অবলাইজড এনটিটির অর্থায়নে PRO-গুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এর মধ্যে উপকূলীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য পুনঃক্রয়, সংগৃহীত বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন কেন্দ্রে পরিবহন এবং বড় পুনঃচক্রায়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মতো কার্যক্রম থাকবে।
প্রয়োজনে থারমাল ট্রিটমেন্ট সাইট স্থাপন এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের সংগঠিত করার উদ্যোগও নেওয়া যাবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক
ইপিআর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অবলাইজড এনটিটিকে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
PRO-এর সঙ্গে ইপিআর-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন নিবন্ধিত ও অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হবে। এসব লেনদেনের প্রমাণও সংরক্ষণ করতে হবে।
প্রতি অর্থবছরের জুলাইয়ের মধ্যে PRO-কে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, পুনঃচক্রায়ন ও পরিত্যাজন সংক্রান্ত প্রতিবেদন অবলাইজড এনটিটির কাছে জমা দিতে হবে।
অন্যদিকে অবলাইজড এনটিটিকে প্রতি অর্থবছরের আগস্টের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরে স্থানীয় বাজারে বিতরণ করা প্লাস্টিক পণ্য ও প্যাকেজিংয়ের পরিমাণ এবং সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি জানাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল না করলে নিবন্ধন নবায়ন করা হবে না। আর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার কারণ এবং ভবিষ্যতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কর্মপরিকল্পনাও পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে।
তৈরি হবে ডিজিটাল ডাটাবেজ
ইপিআর কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে অনলাইন ডিজিটাল পোর্টাল চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে অবলাইজড এনটিটি ও PRO-এর তালিকাভুক্তি, নিবন্ধন এবং প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা হবে।
পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা, পুনরুদ্ধার ক্ষমতা, প্রকৃত পুনরুদ্ধারের পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণের জন্য অনলাইন তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে।
রপ্তানিমুখী শিল্প থাকছে বাইরে
বাংলাদেশে উৎপাদিত বা ব্যবহৃত পুনঃচক্রায়নযোগ্য ও অ-পুনঃচক্রায়নযোগ্য সব ধরনের প্লাস্টিক পণ্য এবং সেগুলো ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্যের ক্ষেত্রে নির্দেশিকাটি প্রযোজ্য হবে।
তবে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে রপ্তানি আদেশের ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে এ নির্দেশিকার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
তিন বছর পর নতুন লক্ষ্যমাত্রা
সরকার স্থির করেছে, নির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার প্রথম তিন বছরের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে।
নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তা সব অবলাইজড এনটিটির জন্য বাধ্যতামূলক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই ব্যবস্থার মূল তাৎপর্য হলো—প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো দায় শুধু সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা সাধারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ওপর না রেখে যারা প্লাস্টিক পণ্য বাজারে আনছে, তাদেরও দায়বদ্ধ করা। তবে এই নীতির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর নজরদারি, নির্ভুল তথ্যভান্ডার, পুনঃচক্রায়ন অবকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।

