দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে পশ্চিমাঞ্চলের রেলযাত্রীদের। যমুনা সেতু ও পদ্মা সেতু হয়ে নতুন রেলপথ চালু হলেও লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচের সংকটের কারণে এতদিন পর্যাপ্ত আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হয়নি। তবে চলতি আগস্ট মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে ২০০টি নতুন কোচ যুক্ত হওয়ায় ঢাকা-পাবনা ও ঢাকা-খুলনা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি খুলনা-মোংলা পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, নতুন কোচ সংযোজনের ফলে পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ট্রেন সংকটও অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বন্ধ থাকা স্টেশন ও লোকাল ট্রেনও চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন ট্রেন চালুর প্রস্তুতি
রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকা-পাবনা এবং ঢাকা-খুলনা রুটে একটি করে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা-খুলনা আন্তঃনগর ট্রেনটি ভবিষ্যতে মোংলা পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়েও কাজ চলছে।
রেলের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ জানান, পাবনা-ঢাকা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তাব ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। খুলনা-ঢাকা রুটের প্রস্তাবও চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেলেই নতুন ট্রেন চালুর কার্যক্রম শুরু হবে।
নতুন রেলপথ, কিন্তু ট্রেনের সংকট
গত কয়েক বছরে দেশের রেল যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
২০১৮ সালে যমুনা সেতু হয়ে পাবনা রুটে রেল চলাচল শুরু হয়।
২০২২ সালে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-যশোর ও ঢাকা-ফরিদপুর রুট চালু হয়।
২০২৪ সালে খুলনা-মোংলা রেললাইন উদ্বোধন করা হয়।
কিন্তু নতুন রেললাইন চালু হলেও ইঞ্জিন ও কোচের স্বল্পতার কারণে এসব রুটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আন্তঃনগর ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে যমুনা সেতু হয়ে পাবনা এবং খুলনা-মোংলা রুটে এখনও কোনো নিয়মিত আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়নি।
যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবি
রাজশাহী, যশোর, পাবনা ও খুলনা অঞ্চলের যাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন ট্রেন চালু এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া লোকাল ট্রেন পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন।
যশোরবাসীর অভিযোগ, পদ্মা সেতু রেলপথ চালুর পরও সকালে ঢাকাগামী কোনো আন্তঃনগর ট্রেন নেই। স্থানীয়দের দাবি, বেনাপোল, খুলনা ও দর্শনা থেকে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি আরও কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা প্রয়োজন।
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, পদ্মা সেতু রেল প্রকল্প শুরুর সময় যশোর থেকে সকালে ঢাকাগামী একটি ট্রেনের দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই দাবি পূরণ হয়নি।
অন্যদিকে রাজশাহীর যাত্রীরা বন্ধ হয়ে যাওয়া উত্তরাসহ একাধিক লোকাল ট্রেন পুনরায় চালু এবং রাজশাহী থেকে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে নতুন কোচ সংযোজনের দাবি জানিয়েছেন।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামান খান বলেন, শুধু ট্রেন নয়, জনবল সংকটের কারণে বহু স্টেশনও বন্ধ রয়েছে। যাত্রীসেবার স্বার্থে দ্রুত এসব ট্রেন ও স্টেশন চালু করা প্রয়োজন।
জনবল সংকট কাটাতে নতুন নিয়োগ
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু কোচ নয়, স্টেশন মাস্টারসহ প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটও রেলসেবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, নতুন স্টেশন চালু করতে স্টেশন মাস্টার ও সহায়ক জনবল প্রয়োজন। ইতোমধ্যে চুক্তিভিত্তিক স্টেশন মাস্টার নিয়োগ এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। পর্যায়ক্রমে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো পুনরায় চালু করা হবে।
যাত্রীসেবায় নতুন সম্ভাবনা
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোচ যুক্ত হওয়ার ফলে শুধু নতুন আন্তঃনগর ট্রেনই নয়, বিদ্যমান ট্রেনগুলোর কোচ সংকটও কমবে। এতে যাত্রী ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, টিকিট সংকট কিছুটা লাঘব হবে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় আশা করছে, নতুন কোচ সংযোজন, জনবল নিয়োগ এবং ধাপে ধাপে ট্রেন ও স্টেশন চালুর মাধ্যমে যাত্রীসেবায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

