ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে ম্যাকাই টেস্টে নেমেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না ব্যাটিংয়ে। মিচেল স্টার্কের ভয়ংকর গতি ও সুইংয়ের সামনে একের পর এক ব্যাটার আত্মসমর্পণ করায় নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ সর্বনিম্ন রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ।
মাত্র ৬৪ রানেই গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ ধসিয়ে দিতে অস্ট্রেলিয়ার লেগেছে মাত্র ৩৪ ওভার।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিয়েছিল তারা। কিন্তু ম্যাকাই টেস্টের শুরুতেই সেই ধারাবাহিকতায় বড় ধাক্কা খেল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
স্টার্কের ২২ বলের ঝড়
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের ইনিংস শুরু থেকেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মিচেল স্টার্কের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি বাংলাদেশের টপ অর্ডার।
ইনিংসের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরান স্টার্ক। এরপর নিজের পরের ওভারে টানা দুই বলে তানজিদ হাসান তামিম ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে ফিরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার।
প্রথম তিন ব্যাটারের কেউই রানের খাতা খুলতে পারেননি।
এরপর মুমিনুল হকও স্টার্কের শিকার হন। মাত্র ৯ রান করে ফেরেন তিনি। মাত্র পাঁচ বল খেলেই ডাক মেরে সাজঘরে ফেরেন লিটন দাস।
ফলে মাত্র ৬.৪ ওভারে ১২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
এই সময় স্টার্ক চার ওভার বল করে তিনটি মেডেনসহ মাত্র চার রান দিয়ে পাঁচ উইকেট তুলে নেন। টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম ফাইফারের তালিকায়ও এটি তার অন্যতম সেরা বোলিং কীর্তি। এর আগে জ্যামাইকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র ১৫ বলে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
১২ রানে ৫ উইকেট, লাঞ্চে ২৩ ওভারে ৩৫/৬
স্টার্কের তাণ্ডবের পর বাংলাদেশের ইনিংসের হাল ধরার চেষ্টা করেন মুশফিকুর রহিম ও মেহেদী হাসান মিরাজ। কিন্তু দলীয় রান ২১ হতেই ষষ্ঠ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ৪২ বলে মাত্র ৫ রান করে ফেরেন মুশফিক।
লাঞ্চের আগে ২৩ ওভারে ৬ উইকেটে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৫ রান। তখনও নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে সর্বনিম্ন ২৬ রানে অলআউট হওয়ার শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
তবে মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদের ব্যাটে কিছুটা প্রতিরোধ দেখা যায়। প্রথম সেশন শেষে মিরাজ ১১ ও হাসান ৮ রানে অপরাজিত ছিলেন।
মিরাজ-হাসানের প্রতিরোধও টিকল না
দ্বিতীয় সেশনে বল হাতে ফিরে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ভেঙে দেন বাংলাদেশের অষ্টম উইকেটের জুটি।
তৃতীয় স্লিপে বেউ ওয়েবস্টারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ১১ রানে ফেরেন মেহেদী হাসান মিরাজ। হাসানের সঙ্গে তার ১৫ রানের জুটি ভাঙার পর আর বেশি সময় টেকেনি বাংলাদেশের ইনিংস।
পরের ওভারে জশ হ্যাজেলউডের বলে নাথান লায়নের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন হাসান মাহমুদ। তার ব্যাট থেকে আসে ১০ রান।
এরপর প্যাট কামিন্সের শিকার হন তাসকিন আহমেদ। ম্যাথু রেনশর হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ১ রানেই শেষ হয় তার ইনিংস।
৪৩ রানের লজ্জা এড়াল বাংলাদেশ
৩৯ রানে নবম উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে আরও একটি বিব্রতকর রেকর্ডের শঙ্কা তৈরি হয়। টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের সর্বনিম্ন ৪৩ রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ডের খুব কাছে চলে যায় তারা।
তবে তাইজুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত দলকে সেই লজ্জা থেকে বাঁচান। ৩০তম ওভারের শেষ বলে জশ হ্যাজেলউডকে চার মেরে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪৩ রানের গণ্ডি পার করেন তিনি।
এর ফলে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৪৩ রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ড নতুন করে লিখতে হয়নি বাংলাদেশকে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ৬৪ রানেই গুটিয়ে যায় পুরো দল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আশার পর হতাশা
ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশের এমন ব্যাটিং বিপর্যয় এসেছে ডারউইনে দুর্দান্ত এক জয়ের পর। সিরিজের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল বাংলাদেশ।
সেই জয়ের পর ম্যাকাইয়ে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট উপহার দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু টেস্টের শুরুতেই মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়ে বড় ধাক্কা খেল সফরকারীরা।
বাংলাদেশের ব্যাটারদের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ শুরু থেকেই ছিল আগ্রাসী। বিশেষ করে নতুন বলে স্টার্কের গতি, বাউন্স ও নিখুঁত লাইন-লেংথের কোনো উত্তরই দিতে পারেনি বাংলাদেশের টপ অর্ডার।
বাংলাদেশ একাদশে ফিরেছেন শরিফুল
ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশ একাদশে একটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরেছেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। তার জায়গা করে দিতে একাদশের বাইরে রাখা হয়েছে ইবাদত হোসেনকে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাম্প্রতিক হোম ওয়ানডে সিরিজে বল হাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছিলেন শরিফুল। এবার টেস্টেও তার ফেরাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
বাংলাদেশ একাদশ: সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান তামিম, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস (উইকেটরক্ষক), মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম।
অস্ট্রেলিয়া একাদশ: ট্রাভিস হেড, ম্যাট রেনশ, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ, ক্যামেরন গ্রিন, অ্যালেক্স ক্যারি (উইকেটরক্ষক), বেউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স (অধিনায়ক), মিচেল স্টার্ক, নাথান লায়ন ও জশ হ্যাজেলউড।
এখন বাংলাদেশের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
মাত্র ৬৪ রানে প্রথম ইনিংস শেষ হওয়ায় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে এখন কঠিন দায়িত্ব। ব্যাটিং ব্যর্থতার ধাক্কা সামলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে দ্রুত চাপে ফেলতে না পারলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্বাগতিকদের হাতে চলে যেতে পারে।
ডারউইনের ঐতিহাসিক জয়ের পর ম্যাকাইয়ে বাংলাদেশের এমন ব্যাটিং বিপর্যয় তাই শুধু স্কোরকার্ডেই নয়, পুরো সিরিজের লড়াইয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

