অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে প্রস্তুতি ম্যাচের প্রথম দিনে বাংলাদেশের ইনিংস যেন দুই ভিন্ন গল্পের প্রতিচ্ছবি। একদিকে ছিল টপ অর্ডারের চরম ব্যর্থতা, অন্যদিকে একাই প্রতিরোধ গড়ে তোলা মেহেদী হাসান মিরাজের অনবদ্য শতক। শুরুর ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত মিরাজের অপরাজিত ১০৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে ভর করে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রানের লড়াকু সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রায় ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে গেছে বাংলাদেশ দল। আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হবে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ। সেই সিরিজকে সামনে রেখে প্রস্তুতি ম্যাচকে নিজেদের শক্তি-দুর্বলতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছিল টাইগাররা। তবে প্রথম দিনের ব্যাটিং পারফরম্যান্সে যেমন উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে, তেমনি মিরাজের শতক আশার আলোও দেখিয়েছে।
শুরুতেই ধস, ব্যর্থ টপ অর্ডার
টসে জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। কিন্তু ইনিংসের শুরু থেকেই বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ।
মাত্র অষ্টম বলেই কোনো রান না করে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। এরপর শাদমান ইসলাম কিছুটা লড়াই করলেও ৩১ রানের বেশি করতে পারেননি।
অভিজ্ঞ মুমিনুল হক ১৬ রান করে আউট হন। অধিনায়ক শান্ত ৩৭ রানের প্রতিশ্রুতিশীল ইনিংস খেলেও সেটিকে বড় করতে ব্যর্থ হন। মুশফিকুর রহিম রানের খাতা খোলার আগেই বিদায় নেন, আর অমিত হাসান করেন মাত্র ১৫ রান।
একপর্যায়ে মাত্র ১১০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মনে হচ্ছিল দেড়শ রানও হয়তো পার করা সম্ভব হবে না।
বিপর্যয়ের মাঝে একাই মিরাজ
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও এদিন তিনি খেলেছেন একজন অভিজ্ঞ টেস্ট ব্যাটারের মতো। শুরুতে ধৈর্য ধরে উইকেটে সময় কাটান, এরপর সুযোগ বুঝে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে চাপ কমিয়ে আনেন।
সৌম্য সরকারের সঙ্গে ছোট একটি জুটি গড়ে ইনিংসকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। পরে তাইজুল ইসলাম, খালেদ আহমেদ ও হাসান মাহমুদের সঙ্গে ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলের স্কোর বাড়িয়ে নেন।
নিচের সারির ব্যাটারদের নিয়ে ইনিংস টেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার সক্ষমতা ছিল প্রশংসনীয়।
১২৮ বলে শতক, অপরাজিত ১০৯
নিজের ইনিংসকে ধীরে ধীরে বড় করেন মিরাজ। মাত্র ১২৮ বলে শতক পূর্ণ করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ১৪১ বলে অপরাজিত ১০৯ রান করে মাঠ ছাড়েন এই অলরাউন্ডার। তার ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৪টি ছক্কা।
এটি শুধু একটি শতক নয়; দলের জন্য ছিল বিপর্যয় থেকে ফিরে আসার অনুপ্রেরণার ইনিংস। যেখানে অন্য ব্যাটাররা ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে একাই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে দলকে সম্মানজনক সংগ্রহ এনে দিয়েছেন মিরাজ।
স্পিনেই ভুগেছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন অস্ট্রেলিয়া একাদশের স্পিনার কোরি রকিচোলি।
তিনি ২৪ ওভারে ৮৩ রান খরচ করে একাই ৬টি উইকেট তুলে নেন। তার নিয়ন্ত্রিত স্পিনের সামনে বাংলাদেশের টপ অর্ডার কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।
এছাড়া হ্যানো জ্যাকবস, ক্যাম্পবেল থম্পসন ও জেভিয়ার ক্রোন একটি করে উইকেট শিকার করেন।
সিরিজের আগে সতর্কবার্তা, তবু আশার আলো
এই প্রস্তুতি ম্যাচ বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। টপ অর্ডারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কঠিন কন্ডিশনে মিরাজের দায়িত্বশীল শতক প্রমাণ করেছে, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যাট করলে অস্ট্রেলিয়ার উইকেটেও সফল হওয়া সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৩ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্টের আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু ২৬৩ রান নয়, বরং মিরাজের এই ম্যাচসেরা মানসিকতার ইনিংস। এখন প্রয়োজন অন্য ব্যাটারদেরও একই দায়িত্বশীলতা দেখানো।
ডারউইনে প্রস্তুতি ম্যাচের প্রথম দিনের শেষে তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির নাম—মেহেদী হাসান মিরাজ। তার ব্যাটেই মিলেছে প্রতিরোধ, আত্মবিশ্বাস এবং সামনে কঠিন টেস্ট সিরিজের আগে নতুন আশার বার্তা।

