দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও একাধিক প্রার্থী নিয়ে জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২০ আগস্ট। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমেদ।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ভোটের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে খুব বেশি অনিশ্চয়তা না থাকলেও, দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটাভুটি হওয়ায় নির্বাচনটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০ আগস্ট সংসদে ভোট
নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এ নির্বাচনে ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হয়। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অলি আহমেদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।
১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় দুই প্রার্থীই এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এগিয়ে মির্জা ফখরুল
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সাধারণত সেই দলের মনোনীত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
বর্তমান সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ভোটের ফলাফল অনেকটাই অনুমেয় হলেও এবার নির্বাচনটি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকার কারণে। কারণ, ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর সংসদে ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে মির্জা ফখরুল
বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে দলটিতে যোগ দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তিনি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রায় ১৫ বছর বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর তাকে মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন।
সবকিছু ঠিক থাকলে এবার রাষ্ট্রপতি পদে তার অভিষেক হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
মির্জা ফখরুল নিজ নির্বাচনি এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসরের ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। দেশে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার সংস্কৃতি নেই উল্লেখ করে তিনি সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান বলেও জানিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের বক্তব্য দেন তিনি। বিএনপির আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব পদে না থাকার পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতি থেকেও সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রার্থিতা সেই ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অলি আহমেদের লড়াই
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমেদ।
গত ১০ আগস্ট রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনি কর্তা সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের কার্যালয় থেকে অলি আহমেদের পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়।
জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ তখন জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ই তাদের একমাত্র বিবেচনা নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখার লক্ষ্যেই তারা প্রার্থী দিয়েছেন।
তাদের যুক্তি, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচন হলে গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণে জয় কঠিন হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা গণতন্ত্রের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক যোগ্যতা
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং তিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানে বয়স ও যোগ্যতার নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি ৩৫ বছরের কম বয়সী হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারবেন না। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য অযোগ্য হলে বা সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলেও তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য নন।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীর ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধানও প্রযোজ্য।
যেভাবে হবে ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাব এবং অন্য একজন সংসদ সদস্যের সমর্থন থাকতে হয়। পাশাপাশি প্রার্থীকে সম্মতিসূচক বিবৃতিও দিতে হয়।
একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষে নির্ধারিত দিনে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ভোটগ্রহণ হবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে। ভোট দেওয়া ও ভোট গণনার প্রক্রিয়া প্রকাশ্য হবে। একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে। নির্বাচনি কর্তার সিদ্ধান্তই ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
ভোটার কারা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হচ্ছেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। ইসি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংসদে ৩৪৯ জন সদস্য রয়েছেন এবং আইন অনুযায়ী তাদের নাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় রয়েছে।
তবে আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম-৪ আসনে নির্বাচিত একজন প্রার্থী অযোগ্য হওয়ায় ওই আসনে বর্তমানে কোনো ভোটার নেই।
সাধারণ আসনে বিএনপির ২১১ জন, জামায়াতের ৬৮ জন, এনসিপির ৬ জন, অন্যান্য দলের ৭ জন এবং স্বতন্ত্র ৭ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। সংরক্ষিত আসনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১৩ জন এবং স্বতন্ত্র একজন সদস্য রয়েছেন।
এই হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর হাতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি।
১৯৯১ সালের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ সংসদে ভোটাভুটি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরশাদ সরকারের পতনের পর ওই বছর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোটগ্রহণ হয়। সে সময় বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।
ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি। পরবর্তী সময়ে একক প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
ফলে ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। এবার মির্জা ফখরুল ও অলি আহমেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে সেই ধারায় আবার পরিবর্তন আসছে।
শুধু ফল নয়, গুরুত্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় অনেকটাই অনুমেয় হলেও অলি আহমেদের প্রার্থিতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি করেছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের মূল লক্ষ্য জয় নয়; বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে দৃশ্যমান করা।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থীর সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পর রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার সম্ভাবনা। মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর রাষ্ট্রপতি পদে তার সম্ভাব্য অভিষেক বিএনপির রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদে একাধিক প্রার্থীর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এটি দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকছে।

