ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বদলগাছীতে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে পরীক্ষার উত্তরপত্র বিক্রির অভিযোগ, মিলল প্রাথমিক সত্যতা

সিয়াম সিদ্দিকী, নওগাঁ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

বদলগাছীতে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে পরীক্ষার উত্তরপত্র বিক্রির অভিযোগ, মিলল প্রাথমিক সত্যতা

ছবিঃ সংগৃহীত

নওগাঁর বদলগাছী সরকারি মডেল পাইলট হাইস্কুলে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে বার্ষিক পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্ধারিত সময়ের আগেই বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক টি এম আসাদুজ্জামান মামুন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের কিছু পুরোনো বইও অনুমোদন ও যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঘটনাটি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি। বিষয়টি আরও যাচাই করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এক বছর সংরক্ষণের বিধান, তার আগেই খাতা বিক্রির অভিযোগ

বিদ্যালয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করার বিধান রয়েছে। বিশেষ করে বার্ষিক পরীক্ষার উত্তরপত্র কমপক্ষে এক বছর সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যালয়ের বেশ কিছু উত্তরপত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে অবহিত না করেই এসব উত্তরপত্র বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং ঘটনাটি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে।

খাতার সঙ্গে বিক্রি পুরোনো বইও

শুধু পরীক্ষার উত্তরপত্র নয়, বিদ্যালয়ের কিছু পুরোনো বইও একই প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। খাতা ও বই মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে এসব মালামাল বিক্রির ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো কাগজপত্র, বই বা অন্যান্য মালামাল বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন, রেজুলেশন ও হিসাব সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রধান শিক্ষককে না জানিয়ে বিক্রির অভিযোগ

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক অভিযোগ করে বলেন, সহকারী শিক্ষক টি এম আসাদুজ্জামান মামুন তাকে না জানিয়ে গোপনে পরীক্ষার খাতা বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, “সহকারী শিক্ষক আসাদুজ্জামান মামুন আমাকে না জানিয়ে গোপনে খাতা বিক্রি করেছেন। বিষয়টি জানতে পেরে আমি বিস্মিত হয়েছি। একজন সরকারি শিক্ষক এভাবে প্রতিষ্ঠানের খাতা গোপনে বিক্রি করতে পারেন না। আমি তাকে খাতা বিক্রির কোনো অনুমতিও দিইনি।”

তার দাবি, এসএসসি পরীক্ষার আগেই খাতাগুলো বিক্রি করা হয়েছিল এবং বিক্রির টাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিজের কাছে রেখেছিলেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে তার রশিদ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তিনি সেই রশিদ গ্রহণ করেননি বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

পরে পুরো বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয় বলে জানান তিনি।

‘সরকারি নিয়ম না মেনে মালামাল বিক্রির সুযোগ নেই’

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন।

তিনি বলেন, “এ ধরনের কাজ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি বিদ্যালয়ের কাগজপত্র বা মালামাল বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী রেজুলেশন করতে হয় এবং প্রধান শিক্ষকের অনুমোদন থাকতে হয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্ত করছেন।”

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের কোনো মালামাল ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বিক্রি করার সুযোগ নেই।

প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে অভিযোগের সত্যতা

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, ঘটনাটির প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। পরীক্ষার খাতার পাশাপাশি কিছু পুরোনো বইও বিক্রি করা হয়েছে বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, “সরকারি বিধি অনুযায়ী উত্তরপত্র কমপক্ষে এক বছর সংরক্ষণ করতে হয়। এর আগে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক টি এম আসাদুজ্জামান মামুন তা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “এগুলো অসত্য। হেড মাস্টার থাকতে আমি কীভাবে করব? এগুলো আমার ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা।”

অর্থাৎ, একদিকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোপনে খাতা বিক্রির অভিযোগ তুলেছেন, অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক বিষয়টি অস্বীকার করছেন। ফলে প্রকৃতপক্ষে কে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কার অনুমোদনে উত্তরপত্র ও বই বিক্রি করেছেন—তদন্তে এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে প্রশাসন

ঘটনাটি ঘিরে এখন কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে—উত্তরপত্রগুলো নির্ধারিত সময়ের আগে কেন বিক্রি করা হলো, কার অনুমোদনে তা করা হয়েছে, বিক্রির অর্থ কোথায় জমা হয়েছে, বিদ্যালয়ের রেজুলেশন বা সংশ্লিষ্ট নথি তৈরি করা হয়েছিল কি না এবং বিক্রি করা মালামালের সঠিক পরিমাণ ও মূল্য কত।

তদন্ত কমিটি এসব বিষয় যাচাই করলে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং সরকারি বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিদ্যালয়ের মতো একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার নথি ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!