ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

পাঁচ মাস কমিশনহীন দুদক: ১৩ হাজার অভিযোগ ঝুলে, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই কার্যত অচল

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২৬, ১০:২০ এএম

পাঁচ মাস কমিশনহীন দুদক: ১৩ হাজার অভিযোগ ঝুলে, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই কার্যত অচল

ছবিঃ সংগৃহীত

দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে কার্যত পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বহীন। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে নতুন অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন, আসামি গ্রেপ্তার, সম্পদ জব্দ, বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা, ঘুষের ফাঁদ মামলা (ট্র্যাপ কেস) এবং উচ্চ আদালতে আপিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।

দুদক সূত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং আইন বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমিশন না থাকায় গত পাঁচ মাসে জমা পড়া প্রায় ১৩ হাজার দুর্নীতির অভিযোগ কার্যত নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। অভিযোগের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, অথচ সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো কোনো কমিশন না থাকায় অনুসন্ধান ও তদন্তের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ঝুলে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সংকট নয়; বরং দেশের দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকারের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

বিচারপ্রার্থীদের অধিকার প্রশ্নের মুখে

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন— "বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।" বিচারহীনতার সেই প্রতীকী চিত্র যেন নতুন করে আলোচনায় এসেছে দুদকের বর্তমান পরিস্থিতিকে ঘিরে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও আইনানুগ বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিকার প্রত্যাশী হাজারো মানুষ এখন কার্যকর কমিশনের অভাবে সেই সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাঁচ মাস ধরে কমিশনহীন দুদক

চলতি বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন-এর নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত নতুন কমিশন গঠন করা সম্ভব হয়নি।

দুদক আইন অনুযায়ী, চেয়ারম্যান বা কমিশনারের পদ শূন্য হলে ৩০ দিনের মধ্যে তা পূরণের বিধান রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিশন গঠন না হওয়ায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো দুদক এত দীর্ঘ সময় কমিশনশূন্য অবস্থায় রয়েছে।

থমকে গেছে দুর্নীতি দমন কার্যক্রম

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশন না থাকায়—

নতুন অনুসন্ধান অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না;
নতুন মামলা দায়েরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না;
ট্র্যাপ কেস পরিচালনা বন্ধ রয়েছে;
আসামির বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাচ্ছে না;
সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত আটকে আছে;
উচ্চ আদালতে আপিলের অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না;
গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে আছে।

ফলে শুধু অভিযোগকারীরাই নন, অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তিও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তদন্ত সম্পন্ন হলেও কমিশনের সিদ্ধান্ত না থাকায় তাদের বিরুদ্ধেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।

সাবেক মহাপরিচালকের প্রশ্ন

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মইদুল ইসলাম বলেন,

"দুদকের মতো ক্ষমতাবান ও সাংবিধানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ মাস ধরে কার্যত অচল করে রাখা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনে স্পষ্টভাবে ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই বিধান মানা হয়নি।"

তার মতে, কমিশন না থাকায় দুর্নীতিবাজরা সুবিধা পাচ্ছে এবং দেশের দুর্নীতি দমন কার্যক্রম বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

টিআইবির মতামত

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,

"নতুন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সততা, দক্ষতা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।"

তিনি বলেন, কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করা জরুরি।

সচিবের আশ্বাস

দুদকের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, সার্চ কমিটির কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর খুব শিগগিরই নতুন কমিশন গঠন হতে পারে।

তবে তিনি বলেন, সার্চ কমিটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ায় দুদকের প্রশাসনের কাছে অভ্যন্তরীণ তথ্য নেই।

সার্চ কমিটির কার্যক্রম

গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।

পরে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে আবেদন আহ্বান করলে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়ে।

সূত্র জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে প্রায় ১৮ থেকে ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সার্চ কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দুটি করে নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। সেখান থেকেই চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে।

আলোচনায় যেসব নাম

নতুন কমিশনে সাবেক বিচারপতি, জেলা জজ, সাবেক সচিব, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো নাম নিশ্চিত করা হয়নি।

দুদক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় যাদের নাম বেশি আলোচনায় থাকে, শেষ পর্যন্ত অনেক সময় তাদেরই নিয়োগ দেওয়া হয় না। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনো বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

দুদকের ২১ বছরের ইতিহাস

২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠা করা হয়।

প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। এরপর বিভিন্ন সময়ে হাসান মশহুদ চৌধুরী, গোলাম রহমান, বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন-এর নেতৃত্বে মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে।

এর মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকিগুলো বিভিন্ন কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়।

বড় প্রশ্ন— কবে ফিরবে কার্যকর দুদক?

দুর্নীতি দমন বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনবিহীন দুদক যত দীর্ঘদিন থাকবে, ততই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দুর্বল হবে এবং বিচারপ্রার্থীদের আস্থা কমবে।

তাদের ভাষ্য, দ্রুত একটি স্বাধীন, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা গেলে শুধু স্থবিরতা কাটবে না, বরং দেশের দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাও পুনরুদ্ধার হবে।

বর্তমানে সবার নজর এখন সার্চ কমিটির সুপারিশ ও রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!