ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির দক্ষিণ ক্যাম্পাসসংলগ্ন বহুল পরিচিত ছাত্রাবাস এলাকা সত্য নিকেতনে ছয়তলা একটি ভবন হঠাৎ ধসে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত আরও দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস, দিল্লি পুলিশ, এনডিআরএফসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার বেলা সাড়ে ১টার দিকে আর কে পুরমের সত্য নিকেতনের একটি পুরোনো ছয়তলা ভবন আচমকা ধসে পড়ে। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো ভবনটিতে ‘হোস্টেল ডেজ’ নামে ৭৫ শয্যার একটি পেইং গেস্ট (পিজি) হোস্টেল পরিচালিত হতো। সেখানে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করতেন।

বেসমেন্টে মেরামতের কাজ চলছিল
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ভবনটির বেসমেন্টে মেরামত বা সংস্কারকাজ চলছিল। সেই কাজের সময়ই ভবনটি হঠাৎ করে ধসে পড়ে। তবে মেরামতকাজের সঙ্গে ভবন ধসের সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনটি ধসে পড়ার সময় মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশে বিকট শব্দ ও ধুলার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো ছয়তলা ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ছুটির দিন হওয়ায় ঘটনার সময় ভবনের ভেতরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ও আবাসিক ছিলেন বলে স্থানীয়দের ধারণা।
ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়াদের উদ্ধারে অভিযান
ভবন ধসের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই অনেকে ঝুঁকি নিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।
.webp)
উদ্ধারকাজে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কয়েকজন মোবাইল ফোনে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। কোথাও কোথাও আটকে থাকা ব্যক্তিদের সাহায্যের আকুতিও শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
খবর পেয়ে দিল্লি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (এনডিআরএফ) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। উদ্ধারকাজে ১২টিরও বেশি ফায়ার টেন্ডার, ভারী এক্সক্যাভেটর ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কয়েকজনকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ আটকা আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে উদ্ধারকারীরা সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালাচ্ছেন।
পাশের ভবনও খালি করা হয়েছে
ভবন ধসের পর আশপাশের ভবনগুলোতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় পাশের একটি ভবন খালি করে দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি আশপাশের স্থাপনার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উদ্ধারকারীদের জন্যও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, যাতে ভেতরে জীবিত কেউ থাকলে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা
দুর্ঘটনার পর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
উপ-রাজ্যপাল তারানজিৎ সিং সান্ধুও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধার তৎপরতা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
ভবন ধস নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর দিল্লির রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ ভবন ধসের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফল বলে অভিযোগ করেছেন।
তবে ভবনটি কেন ধসে পড়ল, ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে আগে কোনো অভিযোগ ছিল কি না এবং মেরামতকাজের অনুমোদন বা নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্তের পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থী-অধ্যুষিত এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সত্য নিকেতন দিল্লির দক্ষিণ ক্যাম্পাসসংলগ্ন একটি পরিচিত ছাত্রাবাস এলাকা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এখানে পিজি ও ভাড়া বাসায় থাকেন। ফলে আবাসিক ভবনটির ধসের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
পুরোনো ভবনে অতিরিক্তসংখ্যক শিক্ষার্থী ও আবাসিক রাখা, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা, সংস্কারকাজের নিরাপত্তা এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা—এসব বিষয় নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আটকা পড়ে থাকলে দ্রুত তাদের শনাক্ত করে নিরাপদে উদ্ধার করা। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর ভবনটির কাঠামোগত অবস্থা, মেরামতকাজ এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।

