ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

শেখ হাসিনা কি দিল্লির কৌশলগত সম্পদ?

ভারতে শেখ হাসিনা: আশ্রয়প্রার্থী নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির ‘তুরুপের তাস’?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ১০:২১ এএম

ভারতে শেখ হাসিনা: আশ্রয়প্রার্থী নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির ‘তুরুপের তাস’?

ছবিঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রনেতা বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আশ্রয় দেওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি শুধু মানবিক আশ্রয়ের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সময়ের সঙ্গে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছেন।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই কূটনৈতিক অঙ্গন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ভারতের কাছে তিনি কি শুধুই একজন আশ্রয়প্রার্থী, নাকি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সম্পদ?

ইতিহাস কী বলে?

ভারত অতীতেও বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের দীর্ঘ সময় আশ্রয় দিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা। ১৯৫৯ সালে চীন থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। ভারত কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে চীনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা না বললেও, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টিকে কৌশলগত চাপের অংশ হিসেবে দেখে এসেছে।

একইভাবে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশটির বহু সাবেক মন্ত্রী, কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ ভারতে আশ্রয় নেন। তাদের মাধ্যমে ভারত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ধরে রাখার চেষ্টা করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ রয়েছে।

কেন শেখ হাসিনার বিষয়টি ভিন্ন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার অবস্থান দালাই লামা বা অন্য কোনো নির্বাসিত নেতার মতো নয়। তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের সরকারপ্রধান এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সভাপতি। প্রশাসন, নিরাপত্তা, কূটনীতি, ব্যবসা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তার দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল।

এ কারণেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, তার ভারতে অবস্থান নয়াদিল্লির জন্য একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপট

দীর্ঘদিন ধরেই ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

২০১৮ সালে শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, "আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, তারা সারা জীবন মনে রাখবে।"

২০২২ সালে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও মন্তব্য করেছিলেন, শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চীন-ভারত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা গত এক দশকে আরও তীব্র হয়েছে।

চীন বাংলাদেশের পদ্মা রেলসংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ, বন্দরসহ বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশকে নিজেদের নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যদি আরও বেশি চীনমুখী হয়, তাহলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প প্রভাবের মাধ্যম হতে পারে। তবে এটি বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন; ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো অবস্থান জানায়নি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, শেখ হাসিনার দেশে এখনও রাজনৈতিক অনুসারী রয়েছে। সে কারণে তার উপস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা চলতে পারে।

তবে এ ধরনের বিশ্লেষণ মতামতভিত্তিক এবং এ বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো স্বীকৃতি বা ঘোষণা নেই।

ভারতের সরকারি অবস্থান

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলেছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অবস্থানও একই—এটি একটি আইনি বিষয় এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রত্যর্পণ প্রশ্নে নতুন আলোচনা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার পর তাকে ফেরত চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, প্রত্যর্পণ একটি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া এবং আইন অনুযায়ীই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাসিত কোনো রাজনৈতিক নেতা অনেক সময় আশ্রয়দাতা দেশের জন্য সম্ভাব্য কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারেন। তবে সেই সম্পদ কীভাবে বা আদৌ ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন–ম্যাডিসনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু এইচ. কিড তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, নির্বাসিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা নেতাদের আশ্রয় দেওয়া অনেক সময় স্বাগতিক দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে ভারত কীভাবে দেখছে বা ভবিষ্যতে তার অবস্থান কী ভূমিকা রাখবে—সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!