ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

৪০ মিলিয়ন ডলারের অর্থপরিশোধ বিরোধে উত্তাল পোশাক খাত: এলপিপিকে ব্ল্যাকলিস্টের হুঁশিয়ারি, ঝুঁকিতে ৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

৪০ মিলিয়ন ডলারের অর্থপরিশোধ বিরোধে উত্তাল পোশাক খাত: এলপিপিকে ব্ল্যাকলিস্টের হুঁশিয়ারি, ঝুঁকিতে ৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক অর্থপরিশোধ বিরোধ নতুন এক মোড়ে পৌঁছেছে। প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৮০ কোটি টাকার বেশি) বকেয়া পণ্যমূল্য পরিশোধ না করেই বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ (অর্ডার) স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে পোল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফ্যাশন রিটেইল প্রতিষ্ঠান এলপিপি (LPP)। এর জেরে দেশের পোশাক শিল্পে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাওনা অর্থ দ্রুত পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এলপিপিকে বাংলাদেশে ‍‍`ব্ল্যাকলিস্ট‍‍` (কালো তালিকাভুক্ত) করার পাশাপাশি বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আন্তর্জাতিক ক্রেতা ফোরাম, দায়িত্বশীল সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সামনে তুলে ধরা হবে।

ব্যবসায়িক বিরোধ নয়, আস্থার সংকট

পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি শুধু বকেয়া অর্থ আদায়ের বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চুক্তির প্রতি সম্মান, ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

তাদের মতে, যদি কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড চুক্তি অনুযায়ী পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করেও নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।

নতুন অর্ডার স্থগিতের ঘোষণা

গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এলপিপি জানায়, বৈশ্বিক সোর্সিং কৌশল পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে নতুন অর্ডার গ্রহণ এবং নতুন পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, একই সময়ে তারা অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের সক্ষমতা মূল্যায়ন করবে এবং ভবিষ্যতের সোর্সিং পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করবে।

তবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের দাবি, এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ ব্যবসায়িক পুনর্মূল্যায়ন নয়; বরং বকেয়া অর্থ আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর সরবরাহকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এলপিপি নতুন অর্ডার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কীভাবে তৈরি হলো ৪০ মিলিয়ন ডলারের বিরোধ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার বাজারে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতায় পড়ে এলপিপি। তখন প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার খুচরা বিক্রেতা এফইএস (FES Retail)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে।

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দাবি, এলপিপির নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই তারা রুশ বাজারের জন্য বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি করেন।

শুরুতে নিয়মিত অর্থ পরিশোধ হলেও প্রায় দেড় বছর আগে থেকে বিল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে এলপিপি জানায়, এফইএস রিটেইলের সঙ্গে তাদের কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। এর ফলে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলারের পাওনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

বর্তমানে এ বিরোধে প্রায় ৪০টি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউস জড়িত রয়েছে।

আলোচনার পরও সমাধান হয়নি

ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গত দেড় বছর ধরে তারা চিঠি, ই-মেইল ও একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান চেয়েছেন। প্রতিবারই আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো অর্থ পরিশোধ হয়নি।

শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আদালতের শরণাপন্ন হলে এলপিপি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও প্রথম শর্ত হিসেবে মামলা প্রত্যাহারের কথা জানায়। কিন্তু অর্থ পরিশোধের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না থাকায় রপ্তানিকারকরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

বিজিএমইএ-বিকেএমইএর কঠোর অবস্থান

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ না করলে এলপিপিকে বাংলাদেশে ব্ল্যাকলিস্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংগঠন, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্ল্যাটফর্ম এবং দায়িত্বশীল সোর্সিং সংস্থাগুলোর কাছেও আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে।

তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাজারে দায়িত্বশীল ব্যবসার কথা বলা কোনো ব্র্যান্ড যদি সরবরাহকারীদের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখে, তবে সেটি শুধু আর্থিক বিরোধ নয়; এটি ব্যবসায়িক নৈতিকতারও লঙ্ঘন।

বছরে ৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা ঝুঁকিতে

বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এলপিপি প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ৭০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পোশাক সংগ্রহ করে।

সংগঠনটির সভাপতি আবদুল হামিদ বলেন, এত বড় একজন ক্রেতাকে হারানো বাংলাদেশের জন্যও সুখকর নয়। তবে ব্যবসায়িক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে উভয় পক্ষকেই চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

তিনি জানান, এক পর্যায়ে এলপিপি বকেয়া অর্থের মাত্র ৫০ শতাংশ পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু এত বড় ছাড় মেনে নিলে অধিকাংশ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারখানা

বকেয়া অর্থের কারণে অনেক পোশাক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

হেজাজ সোয়েটার্স লিমিটেড জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৪৯ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক এক বছরের বেশি সময় ধরে গুদামে পড়ে আছে।

অন্যদিকে শ্রাবণী নিটওয়্যার প্রায় ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ পায়নি। এছাড়া আরও প্রায় ৩০ হাজার ডলারের পণ্য গুদামে আটকে রয়েছে।

কারখানা মালিকরা বলছেন, কাঁচামাল, উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করেও পণ্যের মূল্য না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত

অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিরোধের নিষ্পত্তি শুধু ৪০ মিলিয়ন ডলার আদায়ের প্রশ্ন নয়; বরং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

তাদের মতে, বাংলাদেশ যদি ন্যায্য পাওনার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের রপ্তানিকারকদের দরকষাকষির সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।

পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে বিরোধ চান না। তবে চুক্তি অনুযায়ী পণ্যের মূল্য পরিশোধ এবং ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই। দ্রুত গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে এলপিপির বিরুদ্ধে ব্ল্যাকলিস্টিংসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!