বগুড়ার শেরপুরে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া নিজ মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আরও দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে জনাকীর্ণ আদালতে বগুড়ার শিশু সহিংসতা অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ মারুফ হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট আলী আসগর রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের রায়ে কঠোর শাস্তি
আদালত একই সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছেন, আসামি জরিমানার দুই লাখ টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে তার সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ ভুক্তভোগী শিশুকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে।
মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেন।
ঘটনার শুরু ২০২০ সালে
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বস্তি এলাকার বাসিন্দা। তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর শিশু মেয়েটি তার বাবার সঙ্গে সৎ মায়ের সংসারে বসবাস করত।
২০২০ সালের ২১ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে ওই ব্যক্তি তার শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
ঘটনার সময় শিশুটির সৎ মা স্থানীয় একটি চাতালে ধান সেদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পর বিষয়টি কাউকে জানালে শিশুটিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
আচরণে পরিবর্তন দেখে সন্দেহ
ঘটনার পর শিশুটির আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন পরিবারের সদস্যরা। সে বাড়ির বিভিন্ন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এ কারণে সৎ মা তাকে শাসন করলে একপর্যায়ে শিশুটি তার কাছে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করে।
তবে প্রথমে স্বামীর বিরুদ্ধে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারেননি সৎ মা। পরে শিশুটি বিষয়টি তার দুই সহপাঠীকে জানায়।
সহপাঠীদের কাছ থেকে ঘটনাটি জানার পর বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় লোকজন শেরপুর থানাকে বিষয়টি অবহিত করেন।
এরপর শিশুটির মা ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর শেরপুর থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন।
গ্রেপ্তারের পর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি
মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্তপর্বে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আলী আসগরের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পরবর্তীতে মামলার বিচারিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আদালত এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষ রায়ে সন্তুষ্ট
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, আদালতের রায়ে বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট। শিশুটির ওপর সংঘটিত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের দেওয়া শাস্তি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
মামলায় আসামিপক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসেন মামলা পরিচালনা করেন।
ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণে গুরুত্ব
এই মামলার রায়ে শুধু আসামির মৃত্যুদণ্ডই নয়, ভুক্তভোগী শিশুর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জরিমানার অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে আসামির সম্পত্তি বিক্রি করে তা ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, মানসিক পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চার বছর আগে সংঘটিত এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে আসামির আইনগতভাবে উচ্চ আদালতে আপিলসহ অন্যান্য আইনি সুযোগ নেওয়ার বিষয়টি প্রযোজ্য থাকবে।

