বিএনপি সরকারের ক্ষমতায় আসার ছয় মাসে রাষ্ট্রের প্রশাসন কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছে—এ প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ-পদোন্নতিতে দলীয় বিবেচনা, ওএসডি সংস্কৃতি এবং পেশাদার কর্মকর্তাদের বঞ্চনার অভিযোগ থেকে প্রশাসন কতটা বের হতে পেরেছে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে প্রশাসনে যে মাত্রায় দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছিল, বিএনপি সরকার কি সেই সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিয়েছে? নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে প্রশাসনে কেবল পক্ষের পরিবর্তন ঘটছে? যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য যদি নিয়োগ ও পদায়নের অন্যতম বিবেচনা হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা বজায় থাকবে—এ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
তিন রাজনৈতিক বলয়ে বিভক্ত আমলাতন্ত্র
সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই থেকে আড়াই দশকে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র কার্যত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত—এই তিন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার প্রবণতায় বিভক্ত হয়েছে।
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তা চিহ্নিত ও মূল্যায়নের সংস্কৃতি প্রশাসনের পেশাদার কাঠামোকে দুর্বল করেছে। অথচ একটি আধুনিক রাষ্ট্রে একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত তার পদ, দক্ষতা, সততা ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা; রাজনৈতিক আনুগত্য নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ও যদি পদায়ন, পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবক হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশাসনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা, পক্ষপাতের সংস্কৃতি এবং ‘কোন সরকারের সময় কার অবস্থান কী ছিল’—এ ধরনের হিসাব-নিকাশ আরও জোরালো হয়।
আওয়ামী লীগ আমলের দলীয়করণ থেকে কি বের হতে পারছে প্রশাসন?
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করার দাবি জোরালো হয়। এ লক্ষ্যে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও গঠন করেছিল।
কিন্তু নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্নে সেই সংস্কার-আলোচনার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। দীর্ঘদিন অবসরে থাকা বিএনপি ও জামায়াত-ঘরানার বলে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল করে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
ফলে প্রশাসনে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—পুরোনো দলীয়করণের অবসান ঘটিয়ে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার পরিবর্তে কি কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের কেন্দ্র বদলাচ্ছে?
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে নিয়োগ ও পদায়নের কিছু সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৭৯ সচিবের মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক—নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমান প্রশাসনে সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৭৯ জনের মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তাদের একটি অংশকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবেও চিহ্নিত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৭০-এর বেশি কর্মকর্তা বর্তমানে ওএসডি হয়ে আছেন—এমন দাবিও রয়েছে।
তবে শুধু কোনো কর্মকর্তা ওএসডি হয়েছেন বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন—এ তথ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পক্ষপাত বা অযোগ্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত মূল্যায়নের জায়গা হওয়া উচিত হলো—কে কী যোগ্যতা নিয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন, কীভাবে বাছাই করা হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনে তার দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ কী।
দলীয় পরিচয় থাকলেই কি অযোগ্য?
সরকারের পক্ষ থেকেও প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিনের বক্তব্য, যারা ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় জনগণের অধিকার লঙ্ঘনে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের যুক্তি—যারা আগের সরকারের সঙ্গে থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও অনিয়মে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের একই অবস্থানে রেখে প্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুক্তির বাস্তব প্রয়োগে সতর্কতা জরুরি। কারণ কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয়, পূর্ববর্তী সরকারের সময় পদায়ন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে দায়িত্ব পালন—এসবের ভিত্তিতে সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার করলে প্রশাসনে আরেক দফা বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, যারা আগের সময়ে বঞ্চিত হয়েছেন তাদের মধ্যে যোগ্যদের কাজে লাগাতে হবে; একই সঙ্গে আগের সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করলেও যারা ভালো কর্মকর্তা ছিলেন, তাদেরও দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে কাজে লাগাতে হবে।
অর্থাৎ, প্রশাসনে সংস্কারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ব্যক্তি বা দলের আনুগত্য নয়—যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও কাজের রেকর্ড।
১২ অধিদপ্তর ও করপোরেশনে দলীয় পদধারীদের নিয়োগ
সম্প্রতি ১২টি অধিদপ্তর ও করপোরেশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পদধারীদের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এ কারণে যে, সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দায়িত্ব গ্রহণের সময় দলীয় পদ থেকেও সরে দাঁড়াননি বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক সরকারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু পদে রাজনৈতিক আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। আবার অন্যদের বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক পদে সরাসরি দলীয় পরিচয় বহনকারী ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, দলীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের পক্ষে বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণকে সেবা দেওয়া কতটা সম্ভব—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তার মতে, এ ধরনের নিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি ফল হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়া।
‘দলীয়করণ’ বনাম ‘প্রশাসনিক দক্ষতা’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দলীয় নিয়োগের বিতর্ককে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মূল সংকট হলো—কোন ব্যক্তি কী যোগ্যতা নিয়ে দায়িত্ব পাচ্ছেন এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।
একজন ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও যদি তার প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্ব থাকে, তাহলে তার সক্ষমতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যেমন যুক্তিযুক্ত নয়; তেমনি শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে অদক্ষ কাউকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে বসানোও প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর।
অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের মতে, যে দলই ক্ষমতায় আসে, তারা নিজেদের সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারী খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু এই কৌশল শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দল বা সরকারের জন্যও সুফল বয়ে আনে না।
কারণ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা। কর্মকর্তা যদি মনে করেন, সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে তার পদ, পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎও রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে, তাহলে তিনি জনগণের প্রতি নয়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ, বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন
প্রশাসনে রাজনৈতিক নিয়োগের উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা হয়। ১৮২৯ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময় ‘স্পয়েলস সিস্টেম’-এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সরকারি পদে নিয়োগের প্রবণতা জোরালো হয়েছিল। পরে ১৮৮৩ ও ১৯৭৮ সালের সংস্কারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নিয়োগ কাঠামোয় মেধা ও পেশাদারিত্বের গুরুত্ব আরও প্রতিষ্ঠিত হয়।
জিমি কার্টারের আমলে প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও রাজনৈতিক নিয়োগের মধ্যে একটি ভারসাম্যের কথাও আলোচনায় আসে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মডেলকে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। কারণ সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, নিয়োগব্যবস্থা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে।
অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের ভাষায়, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো—সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও স্বচ্ছতার কাঠামো একইভাবে ভেঙে পড়েনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বেশি।
ওএসডি সংস্কৃতি কি বন্ধ হবে?
বাংলাদেশের প্রশাসনে ওএসডি বা ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। সরকার পরিবর্তনের পর অনেক কর্মকর্তাকে একসঙ্গে ওএসডি করা এবং নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার অভিযোগ প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ই শোনা যায়।
এই সংস্কৃতি প্রশাসনের জন্য দ্বিমুখী ক্ষতি তৈরি করে। একদিকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দক্ষতা কাজে লাগানো যায় না, অন্যদিকে সক্রিয় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যেও রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে; কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন দায়িত্বহীন রেখে দেওয়া হলে রাষ্ট্রই তার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়।
সরকারের দাবি, প্রশাসন এখন আগের চেয়ে নিরপেক্ষ
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য প্রশাসনে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনের দিনগুলোতে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে এবং সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।
সরকারের এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার বড় পরীক্ষা হবে আগামী দিনগুলোতে। কারণ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা শুধু সরকারের বক্তব্যে নয়, বরং নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিফলিত হতে হবে।
ছয় মাসের মূল্যায়নে আসল প্রশ্ন
বিএনপি সরকারের ক্ষমতার প্রথম ছয় মাসে প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন এসেছে—এটি যেমন সত্য, তেমনি পুরোনো রাজনৈতিক নিয়োগ ও প্রভাবের সংস্কৃতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে কি না, সেটি এখনও বড় প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগ আমলের দলীয়করণের সমালোচনা করে যদি নতুন সরকার একই ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তা বাছাই করে, তাহলে প্রশাসনিক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর যদি আগের সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা ও নতুন করে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের একই মানদণ্ডে—যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও কাজের রেকর্ডের ভিত্তিতে—মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে প্রশাসনে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মূল বক্তব্যও সেখানেই—প্রশাসনে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, পেশাদারিত্বই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কারণ সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে যায়। সেই প্রশাসন যদি প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক রঙ ধারণ করে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না—বরং ব্যক্তি ও দলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তাই বিএনপি সরকারের ছয় মাসের প্রশাসনিক মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেবল ‘কারা নিয়োগ পেলেন’ নয়; বরং কেন পেলেন, কী যোগ্যতায় পেলেন, তাদের কাজ কী এবং তারা জনগণের কাছে কতটা জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ থাকছেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

