ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

সমাজসেবা অধিদপ্তরে ক্রয়কাজে অনিয়মের অভিযোগ: পিপিআর লঙ্ঘনে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম

সমাজসেবা অধিদপ্তরে ক্রয়কাজে অনিয়মের অভিযোগ: পিপিআর লঙ্ঘনে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের তথ্য

ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে সরকারি অর্থে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনাকাটায় এসব বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

দাপ্তরিক নথিপত্র, ক্রয়সংক্রান্ত হিসাব এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনায় প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে Request for Quotation (RFQ) পদ্ধতিতে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, সরাসরি ভাউচারের মাধ্যমে সীমার অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং আগের অর্থবছরে হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে ফেরত পাঠানো ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার একটি বিল নতুন অর্থবছরে পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে আসা এসব তথ্যের ভিত্তিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (গুদাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন) মো. কামরুল হাসান সরকার এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. ফিরাদুল হক-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও দাপ্তরিক ব্যাখ্যাও রয়েছে; চূড়ান্তভাবে অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

RFQ পদ্ধতিতে সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয়ের অভিযোগ

সরকারি ক্রয় বিধিমালায় RFQ পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আর্থিক সীমা রয়েছে। কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণের দাবি অনুযায়ী, ওই সীমার মধ্যে না রেখে বিভিন্ন খাতে RFQ পদ্ধতিতে মোট ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকার ক্রয়কাজ দেখানো হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, একই ধরনের কাজ বা পণ্যকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে পৃথক ক্রয় দেখানো হয়েছে। এর ফলে বড় অঙ্কের ক্রয়কে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্রের আওতায় না এনে RFQ পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিউ বাকেড়গঞ্জ ডেকোরেটর, ক্যাপিটাল ইলেকট্রিক, আরজে কনস্ট্রাকশন, সেলভিশন সিস্টেমস ও আফরিন এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, বাজারদর যাচাই, কাজের প্রকৃত পরিমাণ এবং প্যাকেজ বিভাজনের যৌক্তিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এ বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।

ভাউচারের মাধ্যমে ২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের অভিযোগ

শুধু RFQ নয়, সরাসরি ভাউচার বা নগদ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

নথি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরাসরি ভাউচারের মাধ্যমে মোট ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এটি সংশ্লিষ্ট ক্রয়পদ্ধতির নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বেশি।

কম্পিউটার সামগ্রী, সেমিনার ব্যাগ, আপ্যায়ন, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী এবং যানবাহন মেরামতের মতো বিভিন্ন খাতে শত শত ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ধরনের ব্যয় প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ পণ্য বা সেবা সরবরাহের বিপরীতে হয়েছে, পণ্যগুলো গুদামে গ্রহণ করা হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন নথি যাচাই ও সরেজমিন তদন্ত।

ফেরত যাওয়া ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল ফের উত্তোলনের অভিযোগ

অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অভিযোগটি উঠে এসেছে, তা হলো আগের অর্থবছরের ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার একটি বিল।

তথ্য অনুযায়ী, বিলটির যথাযথ দাপ্তরিক ভিত্তি ও বিধিসম্মত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকায় হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে তা ফেরত পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী অর্থবছরে একই অর্থ নতুনভাবে পাওনা হিসেবে দেখিয়ে বিলটি পরিশোধ করা হয়।

এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুবের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আগের বছর যে পরিমাণ RFQ-তে কেনাকাটা হয়েছিল, সেই পরিমাণই ব্যয় করা হয়েছে। তবে পরে লিখিত জবাবে তিনি বলেন, স্থগিত বিলগুলো বকেয়া দায় হিসেবে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট থেকে সরকারি নিয়ম ও GFR-এর বিধান মেনে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যে বিল আগে আপত্তির মুখে ফেরত গিয়েছিল, সেটি পরবর্তী অর্থবছরে কোন প্রক্রিয়ায় পুনরায় অনুমোদিত হলো এবং তার বিপরীতে প্রকৃত পণ্য বা সেবা গ্রহণের প্রমাণ কী ছিল?

ক্রয়সংক্রান্ত এসব কার্যক্রমে সমাজসেবা অধিদপ্তরের দুই সহকারী পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।

সহকারী পরিচালক (গুদাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন) মো. কামরুল হাসান সরকার-এর কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি গত অর্থবছরের ডিসেম্বরে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, আলোচিত কিছু ক্রয় ও বিলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. ফিরাদুল হক-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

মহাপরিচালকের ব্যাখ্যায়ও রয়ে গেছে প্রশ্ন

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক লিখিত ব্যাখ্যায় দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট সময়ে RFQ-এর মাধ্যমে বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে কাজ করা হয়েছে এবং বর্তমানে RFQ কমিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র (OTM) পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে RFQ পদ্ধতিতে নতুন কোনো আদেশ না দেওয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের সব ক্রয় ই-জিপি (e-GP) পদ্ধতিতে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে আগের অর্থবছরের ক্রয় ও ব্যয় নিয়ে যেসব অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো কেবল প্রশাসনিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিষ্পত্তি না করে স্বাধীন অডিট ও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্যাকেজ বিভাজন ও ঠিকাদার নির্বাচনেও প্রশ্ন

সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় একই ধরনের কাজকে কৃত্রিমভাবে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে RFQ বা সরাসরি ক্রয়ের আওতায় আনার সুযোগ সীমিত। কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তরের আলোচিত ক্রয়কাজগুলোতে এমন প্যাকেজ বিভাজন হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে একই ধরনের পণ্য বা সেবা বিভিন্ন সময়ে আলাদা ক্রয় হিসেবে দেখানো হলে সেটি কেবল হিসাবের বিষয় নয়; এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তাই সংশ্লিষ্ট ক্রয়ফাইল, কার্যাদেশ, দরপত্র বা কোটেশন, সরবরাহ চালান, গুদাম রেজিস্টার, বিল-ভাউচার এবং অর্থ পরিশোধের ব্যাংক রেকর্ড একসঙ্গে পর্যালোচনা করা জরুরি।

৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকার হিসাব কী বলছে?

অনুসন্ধানে উত্থাপিত অভিযোগের হিসাব অনুযায়ী—

RFQ খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ: ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা
সরাসরি ভাউচার খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ: ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা
আগের অর্থবছরের প্রশ্নবিদ্ধ/ফেরত যাওয়া বিল: ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা
মোট প্রশ্নবিদ্ধ অর্থের পরিমাণ: প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকা

তবে এই অর্থের পুরোটা আত্মসাৎ বা দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে প্রকৃত পণ্য বা সেবা সরবরাহ, সরকারি গুদামে গ্রহণ, কাজের পরিমাণ এবং অর্থ পরিশোধের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন।

তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র

সরকারি অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের দায় নয়; ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ এবং হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি নিরপেক্ষ অডিট, হিসাবরক্ষণ নথি যাচাই এবং প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ক্রয়ফাইল ও আর্থিক নথি সংরক্ষণ, প্রতিটি ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তব সরবরাহ যাচাই এবং পিপিআর ও GFR অনুসরণের বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!