দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও সংসদে ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
সংসদে দলীয় আসনের হিসাবে নির্বাচনের ফল অনেকটাই স্পষ্ট। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের পক্ষে দলীয় ২৪৭ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। জোটের সমর্থনসহ তার পক্ষে ভোটের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫০। বিপরীতে অলি আহমদের পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জনসহ ১১ দলীয় জোটের মোট ৯০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
বর্তমান ভোটার তালিকায় থাকা ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে দুই শিবিরের বাইরে রয়েছেন মাত্র ৯ জন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ভোটের ফল এবং দুই জোটের সব সংসদ সদস্যের ভোট শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে কি না—এ নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
দুই প্রার্থীর লড়াই, সংখ্যার হিসাবে এগিয়ে মির্জা ফখরুল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে সংসদ সদস্যদের ভোটই নির্ধারক। আর বর্তমান সংসদে বিএনপি ও তাদের সমমনা জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুরু থেকেই শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট অলি আহমদকে প্রার্থী করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সংখ্যার হিসাবে জয় কঠিন হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে আরও গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক করার বার্তা দিতে চায় জোটটি।
ফলে আজকের ভোটে মূল আকর্ষণ জয়-পরাজয়ের চেয়ে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান এবং নিজ নিজ জোটের ভোট কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকে, তা নিয়ে।
দুপুর ২টা থেকে ভোট, শেষ হবে বিকেল ৫টায়
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। ভোটগ্রহণের জন্য তার সভাপতিত্বে সংসদ সদস্যদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
যেহেতু ভোটের দিন সংসদের নিয়মিত অধিবেশন নেই, তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনায় ইসির ২০ সদস্যের একটি দল দায়িত্ব পালন করবে। সংসদ সচিবালয় দেবে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও প্রশাসনিক সহায়তা।
গোপন নয়, প্রকাশ্য ব্যালটে ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ সংসদীয় ভোটের মতো হলেও এর ভোট দেওয়ার পদ্ধতিতে রয়েছে বিশেষত্ব। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্য ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ব্যালট পেপারে ভোটদাতার ক্রমিক নম্বর, নাম, বিভক্তি নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নামও উল্লেখ থাকবে।
যে প্রার্থীকে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিতে চান, তার নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে প্রার্থীর পূর্ণ নাম লিখে নিজের স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর ব্যালট পেপার নির্ধারিত তিনটি ব্যালট বাক্সের যেকোনো একটিতে জমা দিতে পারবেন সংসদ সদস্যরা।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর একই কক্ষে ব্যালট গণনা করা হবে। এরপর নির্বাচনি কর্তা হিসেবে সিইসি প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করবে।
ভোটার ৩৪৯ সংসদ সদস্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বর্তমানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে রয়েছেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য।
সংসদের মোট সদস্যসংখ্যা ৩৫০ হওয়ার কথা থাকলেও চট্টগ্রাম-৪ আসনের সদস্যপদ সংক্রান্ত আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জনে।
ভোটের সময় সংসদ সদস্যরা তাদের নির্ধারিত আসনে অবস্থান করবেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা তাদের কাছে ব্যালট পৌঁছে দেবেন এবং ভোটগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন।
১৯৯১ সালের পর আবারও সংসদে ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোটাভুটির সর্বশেষ নজির ১৯৯১ সালের। ওই বছর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর একাধিক প্রার্থী থাকায় জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার আবারও একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে ভোটের আয়োজন করতে হচ্ছে।
৯ ভোটের দিকেও নজর
সংসদে দুই জোটের বাইরে থাকা ৯ জন সংসদ সদস্যের ভোট নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও সংখ্যার বিচারে তাদের ভোট নির্বাচনের ফল পাল্টানোর মতো নয়, তবু ভোটের ব্যবধান নির্ধারণে এই ভোটগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বিএনপি ও সমমনা জোটের ২৫০ এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ জন সংসদ সদস্যের সবাই নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন কি না, সেটিও আজকের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
ফলে ফলাফল প্রায় অনুমিত হলেও ভোটের প্রকৃত চিত্র জানতে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ভোট গণনার পরই মিলবে আনুষ্ঠানিক ফল
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ শেষ হলে সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে। নির্বাচনি কর্তা সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোট গণনা শেষে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীই নির্বাচিত হবেন। কোনো পরিস্থিতিতে দুই প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়ায় ফল নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।
সব প্রক্রিয়া শেষে নির্বাচন কমিশন সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে।

