দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদারের লক্ষ্যে স্থাপিত ভ্রাম্যমাণ খাদ্য পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে প্রবেশের আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিচে রাখা মোবাইল ল্যাবরেটরি ভ্যানটির ভেতরে প্রবেশ করে খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের কার্যক্রম, খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার পদ্ধতি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলমান তদারকি সম্পর্কে অবহিত করেন। কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের আটটি মহানগর এলাকায় এসব পরীক্ষাগারের মাধ্যমে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও তদারকি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এ পরিদর্শনকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চলমান কার্যক্রম পর্যালোচনার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ কার্যক্রমের সফলতা নির্ভর করবে পরীক্ষার নির্ভুলতা, নিয়মিত তদারকি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও তদারকি কার্যক্রম
সচিবালয়ে স্থাপিত ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ এবং তা পরীক্ষার প্রক্রিয়া সরেজমিনে দেখেন। কর্মকর্তারা তাঁকে জানান, ভেজালবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও তদারকি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের অন্যতম সুবিধা হলো, নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ী পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ঘটনাস্থল বা সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রাথমিকভাবে খাদ্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে সন্দেহজনক খাদ্যপণ্য শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহায়তা পেতে পারে।
তবে কোনো নমুনার প্রাথমিক পরীক্ষায় সন্দেহজনক ফল পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা, নমুনা সংরক্ষণ এবং প্রযোজ্য আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার ফল যেন নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য হয়, সে জন্য মানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ এবং যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণও জরুরি।
আট মহানগরীতে চলছে কার্যক্রম, লক্ষ্য ৬৪ জেলা
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের আটটি মহানগর এলাকায় ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের মাধ্যমে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও তদারকি করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মহানগর এলাকার বাইরেও খাদ্যের মান যাচাই এবং ভেজালবিরোধী তদারকি কার্যক্রম বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় খাদ্য পরীক্ষার সুযোগ সীমিত, সেখানে ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা খাদ্যপণ্যের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তদারকি জোরদার করা জরুরি।
তবে ৬৪ জেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষার সরঞ্জাম, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যাপ্ত পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তদারকি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পৃথকভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রযোজ্য আইন ও ক্ষমতার আওতায় তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তদারকি ও পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম খাদ্যের নিরাপত্তা যাচাই এবং ঝুঁকি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক।
খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি, অনিরাপদ সংরক্ষণ কিংবা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের মতো বিষয় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত পরিদর্শন, পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে অনুসন্ধান এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে পরীক্ষার ফল, অভিযোগ এবং আইনগত সিদ্ধান্তের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি। কোনো খাদ্যপণ্যে অনিয়মের সন্দেহ দেখা দিলে যথাযথ পরীক্ষা ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭২টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার ভ্যান সংগ্রহের উদ্যোগ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় ৭২টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার ভ্যান সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। নতুন ভ্যানগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে নমুনা সংগ্রহ, প্রাথমিক পরীক্ষা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
তবে পরীক্ষাগারের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আধুনিক পরীক্ষার সরঞ্জাম, দক্ষ পরীক্ষাকর্মী, নিয়মিত ক্যালিব্রেশন, মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পরীক্ষার ফল সংরক্ষণের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি প্রয়োজন।
ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারগুলো কোথায় কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কোন ধরনের খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হবে এবং পরীক্ষায় অনিয়ম ধরা পড়লে পরবর্তী ব্যবস্থা কী হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকলে কার্যক্রমের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
মনিটরে প্রচার করা হচ্ছে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক সচেতনতা বার্তা
ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভ্যানের বাইরের দিকে স্থাপিত মনিটরে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক ভিডিও প্রচার করা হয়।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সরকারি নজরদারি বা আইনগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সব পক্ষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
খাদ্য কেনার সময় পণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখা, প্যাকেটের অখণ্ডতা যাচাই, নিরাপদভাবে সংরক্ষিত খাবার বেছে নেওয়া এবং সন্দেহজনক খাদ্যপণ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা জনসচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একইভাবে খাদ্য ব্যবসায়ীদেরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, নিরাপদ পানি ব্যবহার, খাদ্যপণ্য সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং দূষণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
খাদ্য নিরাপত্তা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনিরাপদ বা দূষিত খাবার থেকে খাদ্যবাহিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। তাই খাদ্যের মান যাচাই, উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে তদারকি এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নমুনা পরীক্ষা করার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিষয়ে দ্রুত সতর্কতা জারি, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল ও তদারকির তথ্য স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জনসাধারণের সামনে তুলে ধরলে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জবাবদিহি বাড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের তাৎপর্য
সচিবালয়ে ভ্রাম্যমাণ খাদ্য পরীক্ষাগার পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষা ও তদারকির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেছেন। বর্তমানে আটটি মহানগরে পরিচালিত এ কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এবং ৭২টি পরীক্ষাগার ভ্যান সংগ্রহের উদ্যোগ এ খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তবে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে পরীক্ষাগারগুলোর যথাযথ ব্যবহার, দক্ষ জনবল, নিয়মিত তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ এবং ভোক্তাদের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

