নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে অব্যাহত হয়রানি, অনলাইন অপপ্রচার, ব্যক্তিগত হুমকি ও পরিকল্পিত আক্রমণের অভিযোগে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর সরকারের ১২ জন সাবেক উপদেষ্টা। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচার ও হুমকি একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ‘কাপুরুষোচিত চক্রান্ত’।
সাবেক উপদেষ্টাদের অভিযোগ, অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে এবং তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তা করছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং মতপ্রকাশের সুস্থ চর্চার পরিপন্থী।
বিবৃতিতে তাঁরা আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিগত শাসনামলের অনিয়ম ও অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার মতো কঠিন দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করেছে। সেই সময়ের উদ্যোগ ও সংস্কারপ্রক্রিয়াকে অপপ্রচারের মাধ্যমে মুছে ফেলা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।
ইউনূসকে ঘিরে হয়রানি ও হুমকির অভিযোগ
যৌথ বিবৃতিতে সাবেক উপদেষ্টারা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান কুৎসা, অসত্য তথ্য প্রচার, অনলাইন হয়রানি এবং ব্যক্তিগত ও শারীরিক হুমকির অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁদের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য শুধু একজন ব্যক্তিকে হেয় করা নয়; বরং তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলা।
সাবেক উপদেষ্টারা এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কোনো সরকারের সিদ্ধান্ত, নীতি বা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করাও গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সমালোচনার নামে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত হুমকি দেওয়া কিংবা কাউকে লক্ষ্য করে হয়রানি চালানো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাঁদের মতে, রাজনৈতিক বিতর্কে তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ও ভূমিকার কথা স্মরণ
বিবৃতিতে সাবেক উপদেষ্টারা অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিয়ম, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব নিয়েছিল অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার।
তাঁরা দাবি করেন, বিগত শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগের অবসান ঘটানো ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল।
সাবেক উপদেষ্টাদের মতে, এ সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসব উদ্যোগের মূল্যায়ন অবশ্যই তথ্য, প্রমাণ ও বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে তাঁদের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রসঙ্গ
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। সাবেক উপদেষ্টাদের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরে আসার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিগত শাসনামলের ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।
তাঁদের মতে, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্য কেবল একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা নয়; বরং আইনের শাসন, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাবেক উপদেষ্টারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, অধ্যাপক ইউনূসকে ঘিরে অপপ্রচার ও হুমকির ঘটনা সংস্কারপ্রক্রিয়া এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া প্রত্যাশাকে দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে।
‘অপপ্রচার দিয়ে সংস্কারের ম্যান্ডেট মুছে ফেলা যাবে না’
বিবৃতিতে সাবেক উপদেষ্টারা দৃঢ় অবস্থান জানিয়ে বলেন, ভয়ভীতি, অসত্য প্রচার, অনলাইন হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত হুমকি দিয়ে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করা যাবে না।
তাঁদের বক্তব্য, তরুণ সমাজের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যে মর্যাদা, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি করেছে, তা কোনো অপপ্রচারের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তাঁরা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে জড়িত থাকার অভিযোগও তুলেছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং নির্দিষ্ট ঘটনার স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বক্তব্য বা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।
নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে হেনস্তা করার অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় অধ্যাপক ইউনূসকে লক্ষ্য করে কয়েকজনকে উচ্চ স্বরে স্লোগান দিতে দেখা যায়—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে কয়েকজনকে তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার’সহ বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটিকে অধ্যাপক ইউনূসের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে দেখছেন তাঁর সাবেক সহকর্মীদের অনেকে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবাসী সমর্থক এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দরের ওই ঘটনার পর সাবেক উপদেষ্টাদের যৌথ বিবৃতিতে অধ্যাপক ইউনূসকে ঘিরে হয়রানি ও হুমকির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিবৃতিতে যাঁরা স্বাক্ষর করেছেন
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সাবেক ১২ উপদেষ্টার মধ্যে রয়েছেন সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সি আর আবরার, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সাখাওয়াত হোসেন, ফারুক-ই-আজম, ফরিদা আখতার, শারমীন এস মুরশিদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তাঁরা সবাই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা অধ্যাপক ইউনূসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে হয়রানি, হুমকি ও অপপ্রচারের অভিযোগের নিন্দা করেন।
রাজনৈতিক সমালোচনা ও ব্যক্তিগত হয়রানির মধ্যে পার্থক্য জরুরি
অধ্যাপক ইউনূসকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিক বিতর্ক, অনলাইন আচরণ এবং জনপরিসরে ভিন্নমত প্রকাশের সীমা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষাও অপরিহার্য।
অনলাইনে কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা, ব্যক্তিগত হুমকি ও হয়রানি থেকে বিরত থাকা এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের অংশ। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং প্রয়োজন হলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা জরুরি।
সাবেক ১২ উপদেষ্টার যৌথ বিবৃতিতে মূলত অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে কথিত অপপ্রচার ও হেনস্তার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ভয়ভীতি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।

