ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

সরকারের অপেক্ষা নয়, নিজেদের টাকায় রাস্তা বানাচ্ছেন গ্রামবাসী; নাটোরের লালমনিপুরে স্বেচ্ছাশ্রমের অনন্য দৃষ্টান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

সরকারের অপেক্ষা নয়, নিজেদের টাকায় রাস্তা বানাচ্ছেন গ্রামবাসী; নাটোরের লালমনিপুরে স্বেচ্ছাশ্রমের অনন্য দৃষ্টান্ত

ছবিঃ সংগৃহীত

আধুনিক উন্নয়নের নানা সাফল্যের গল্পের মাঝেও নাটোর সদর উপজেলার বড় হরিশপুর ইউনিয়নের লালমনিপুর গ্রামের বাস্তবতা যেন একেবারেই ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার এই গ্রামীণ সড়কে লাগেনি পিচ বা ইটের ছোঁয়া। বর্ষা এলেই কাদায় ডুবে যায় পুরো পথ, আর নারদ নদের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ একটি বাঁশের সাঁকোই হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের একমাত্র ভরসা।

বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও স্থায়ী কোনো সমাধান না পেয়ে এবার নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছেন গ্রামবাসী। প্রশাসনের অপেক্ষা না করে নিজেদের অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু করেছেন তারা।

সোমবার (২০ জুলাই) সকাল থেকে গ্রামের অর্ধশতাধিক তরুণ ও স্থানীয় বাসিন্দা কোদাল, বেলচা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে দেড় কিলোমিটার কাঁচা সড়কে ইট-সুরকি ও বালু ফেলে চলাচল উপযোগী করার কাজ শুরু করেন। গ্রামবাসীর কাছ থেকে চাঁদা তুলে কেনা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী। সারাদিন পরিশ্রম করে রাস্তা সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্ষোভ

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত ও মৌখিকভাবে রাস্তা নির্মাণের দাবি জানানো হলেও প্রতিবারই আশ্বাস মিলেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো উন্নয়ন হয়নি।

তাদের ভাষ্য, জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেন না। ফলে বাধ্য হয়েই নিজেদের উদ্যোগে রাস্তা মেরামতের কাজ শুরু করতে হয়েছে।

যাতায়াতে দুর্ভোগ, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা ও কৃষি

গ্রামবাসীরা জানান, বেহাল সড়কের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। বর্ষাকালে কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে অনেক সময় তারা পড়ে গিয়ে আহত হয়। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক সময় জরুরি রোগী পরিবহন করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া কৃষিপ্রধান এই এলাকার কৃষকরাও উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে গিয়ে বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও সময়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

‘উন্নয়নের বরাদ্দ যায় কোথায়?’

প্রতি বছর গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি বাজেটে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও লালমনিপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তাদের প্রশ্ন, জনগণের করের টাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও কেন এই গ্রামের মানুষ আজও একটি চলাচলযোগ্য রাস্তার জন্য নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন?

তরুণদের নেতৃত্বে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

গ্রামের তরুণ জাহিদ মেহেদী বলেন, "দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কোনো উন্নয়ন হয়নি। তাই আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি অন্তত চলাচলের উপযোগী একটি রাস্তা তৈরি করবো। এলাকার মানুষ যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সেই অনুযায়ী অর্থ দিয়েছেন। সবাই মিলে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছি।"

তিনি বলেন, "এটি শুধু রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার বিরুদ্ধে আমাদের নীরব প্রতিবাদ।"

স্থায়ী সমাধানের দাবি

গ্রামবাসীর দাবি, স্বেচ্ছাশ্রমে সাময়িকভাবে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করা গেলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। দ্রুত লালমনিপুর গ্রামের দেড় কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণ এবং নারদ নদের ওপর একটি টেকসই সেতু নির্মাণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থানীয়দের মতে, উন্নয়নের সুফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সমানভাবে পাওয়ার অধিকার রাখে। তাই লালমনিপুরের মতো অবহেলিত গ্রামগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!