ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

দিল্লিতে হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য ঘিরে ফের ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১০:১০ এএম

দিল্লিতে হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য ঘিরে ফের ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েন

ছবিঃ সংগৃহীত

রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সরকারবিরোধী প্রচারণার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চলমান প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে দিল্লির দাবি, শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।

গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে দিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। ওই বক্তব্যে তিনি জুলাইয়ের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন এবং নিজের সরকারের পতনের পেছনে নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন।

শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, একজন পলাতক ও দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার এবং গণমাধ্যমে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

বাংলাদেশের অভিযোগ, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এসব বক্তব্য বাংলাদেশের রাষ্ট্র, জনগণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণায় পরিণত হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছে ঢাকা।

আগেই দিল্লিকে সতর্ক করেছিল ঢাকা

শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ আগেও ভারতের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনা কিংবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে তা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিতে।

তবে সেই সতর্কতার পরও দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের আয়োজন হওয়ায় ঢাকার অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে।

দিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ওই অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গেও ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই বলে জানায় দিল্লি।

ভারতের যুক্তি হলো—দেশটির ভূখণ্ডে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতপ্রকাশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভারত সাধারণত বাধা দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে না।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ ভারতের এই অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছে। তাদের বক্তব্য, অতীতে ভারতের ভূখণ্ডে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক বক্তব্য বা সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে দিল্লি একই ধরনের উদার অবস্থান নেয়নি।

এর উদাহরণ হিসেবে ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলের ঘটনা সামনে আনা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

ফলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ‘দ্বৈত নীতি’র প্রশ্ন উঠেছে।

হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের বড় অস্বস্তি

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানই বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে থাকা বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি সামনে রেখে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে। তবে দিল্লি এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দিল্লি একদিকে পুরোনো কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কও সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত বাস্তবতার কারণেই শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলী।

সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্যেও চাপ

শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্কের সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রাণহানি, পুশ-ইন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য—এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে।

রাজনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়লে এসব ইস্যুতে আলোচনার পরিবেশও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে নতুন সংকট

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশ চাইলে বিষয়টি কৌশলগতভাবে এড়িয়ে যেতে পারত; তবে সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। এখন দেখতে হবে এই অবস্থান কূটনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হয়।

অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক। তার অভিযোগ, আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি একজন পলাতক আসামিকে দেশে ফেরত না পাঠিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান।

সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায় ঢাকা

শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো প্রশ্ন নেই বলে জানিয়েছে ঢাকার রাজনৈতিক মহল। বরং দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের বক্তব্যেও সেই বার্তা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সম্পর্ক বহুমুখী এবং বাংলাদেশের পক্ষে কোনো একটি ইস্যুতে আটকে থাকা সম্ভব নয়। দুই দেশের জনগণের স্বার্থে ভালো সম্পর্ক প্রয়োজন হলেও সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিতে।

তিনি একই সঙ্গে ভারতের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভারতের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ অত্যন্ত বিবেচনাপ্রসূত হওয়া প্রয়োজন।

কোন পথে যাবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক?

শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। একদিকে প্রত্যর্পণ ইস্যু, অন্যদিকে রাজনৈতিক বক্তব্য ও ভারতীয় ভূখণ্ডের ব্যবহার—দুটি বিষয়ই ঢাকার কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

তবে এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, যোগাযোগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত। ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও সম্পর্ক পুরোপুরি মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ কম।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে হলে উভয় পক্ষকেই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা, পারস্পরিক আস্থা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্নে দিল্লির অবস্থান আগামী দিনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!