সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ধারাবাহিক কর্মসূচিতে হামলা, বাধা ও সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। টানা তিন দিনের ঘটনাপ্রবাহে একদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি, অন্যদিকে এনসিপি—উভয়পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ নয়; বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এদিকে বিএনপি বলছে, তারা কোনো হামলার রাজনীতি সমর্থন করে না। অন্যদিকে এনসিপির অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জে হামলা, আহত শীর্ষ নেতারা
গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে ‘জুলাই পদযাত্রা’ শেষে বক্তব্য চলাকালে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আহতদের মধ্যে নবীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশক্তির নেতা আলিফ চৌধুরী গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তিনি ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। দলটির দাবি, হামলায় তার একটি চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছে এনসিপি। যদিও বিএনপির স্থানীয় নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এনসিপির নেতাদের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও হবিগঞ্জের বিএনপি নেতা জি কে গউছকে নিয়ে অশোভন মন্তব্য করায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ১৪৪ ধারা
হামলার প্রতিবাদে ২৯ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয় এনসিপি। তবে হবিগঞ্জে কর্মসূচির আগে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। ফলে কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এনসিপির অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সাংবিধানিক অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলে পুলিশি বাধা
একই দিন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ঢাকা থেকে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হলে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও এলাকায় পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যের সামনে ট্রাক রেখে পথরোধ করা হয় বলে অভিযোগ করে এনসিপি। এ সময় নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহসহ দলের শীর্ষ নেতারা সড়কেই অবস্থান নেন এবং পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
পরে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকায়ও তাদের গাড়িবহর থামিয়ে দেওয়া হয়।
গোলাপগঞ্জে ফের হামলা
টানা উত্তেজনার মধ্যে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে সিলেটের গোলাপগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আবারও হামলার ঘটনা ঘটে।
দলের অভিযোগ, এ সময় সারজিস আলমের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং কয়েকজন নেতাকর্মীকে মারধর করা হয়। এতে সিলেট অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন,
“বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া শেখ হাসিনার সময়ের কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। কপি করে আন্দোলন দমন না করে নতুন কৌশল নিয়ে আসুন।”
তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এনসিপির অভিযোগ: ‘ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি’
এনসিপির মিডিয়া সেলের প্রধান মাহবুবুল আলম অভিযোগ করে বলেন,
“চব্বিশের জুলাইয়ে আমরা দেখেছি ভিন্নমতের ওপর শেখ হাসিনার বাহিনী হামলা করেছে। এখন একই ধরনের আচরণ তারেক বাহিনীর কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। হামলাকে বৈধতা দিতে নানা গল্প তৈরি করা হচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, সাংবাদিকদের পর এখন এনসিপিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং হামলার কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি।
বিএনপির বক্তব্য
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন,
“আমরা চাই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক। রাজনৈতিক দল মত প্রকাশ করবে, এতে আপত্তি নেই। তবে মত প্রকাশেরও একটি সভ্য ও শালীন মান থাকা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বলেন,
“বিএনপি কোনো হামলার রাজনীতি সমর্থন করে না। হবিগঞ্জের ঘটনায় কারা জড়িত, তা স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করে দেখবে।”
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন,
“মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও বাস্তবে ভিন্নমত দমন করা হচ্ছে। এনসিপির কর্মসূচিতে হামলা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।”
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে ১১ দলীয় জোটের বৈঠকে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, হামলার অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তার ভাষায়,
“এনসিপি জুলাই আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক শক্তি। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরও রয়েছে। ধারাবাহিক হামলার ফলে রাজনৈতিকভাবে তারা আরও বেশি আলোচনায় চলে আসতে পারে।”
তিনি উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন,
“রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েই দিতে হবে। হামলা কিংবা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাও একই ধরনের মত প্রকাশ করে বলেন, মতবিরোধ থাকলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক উপায়ে প্রতিবাদ জানানো উচিত; সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত?
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণেরও ইঙ্গিত বহন করছে।
বিশেষ করে সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা, সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, প্রধান বিরোধী শক্তিগুলোর অবস্থান এবং মাঠের রাজনীতিতে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ঘটনাগুলোর দায় কার—তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সব পক্ষের রাজনৈতিক সংযমই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

