ঢাকা রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সিংড়ায় কচুরিপানায় ৩০০ একর জমি, অনিশ্চিত বোরো আবাদ

মোঃ ইব্রাহিম আলী, সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

সিংড়ায় কচুরিপানায় ৩০০ একর জমি, অনিশ্চিত বোরো আবাদ

ছবিঃ সংগৃহীত

বর্ষার পানি নেমে গেলেও নামছে না কচুরিপানার বিশাল স্তূপ। উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানায় নাটোরের সিংড়া উপজেলার ৫ নম্বর চামারী ইউনিয়নের কান্দি, ঘুটিয়া ও মহিষমারী গ্রামের বিস্তীর্ণ বিলের কৃষিজমি ঢেকে গেছে। এতে প্রায় ৩০০ একর জমিতে বোরো ধান চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিপাকে পড়েছেন শতাধিক কৃষক।

কৃষিপ্রধান এই বিল এলাকায় বোরো মৌসুম শুরুর আগে জমি প্রস্তুত করার সময় চলে এলেও কচুরিপানার কারণে অনেক জমি এখনো চাষের উপযোগী করা সম্ভব হয়নি। ফলে একদিকে সময়মতো বোরো আবাদ শুরু নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে জমি পরিষ্কার করতে গিয়ে কৃষকদের বাড়তি শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

কৃষকদের দাবি, প্রতি বিঘা জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করতে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এতে এমনিতেই বাড়তি কৃষি উপকরণ ব্যয়ের সঙ্গে নতুন করে কচুরিপানা পরিষ্কারের খরচ যোগ হওয়ায় বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

৩০০ একর জমিতে কচুরিপানার দখল

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কান্দি-ঘুটিয়া-মহিষমারী গ্রামের বিলের প্রায় ৩০০ একর জমিতে কচুরিপানা জমেছে। বর্ষায় উজান থেকে পানির সঙ্গে ভেসে আসা কচুরিপানা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকার পর পানি কমে গেলেও অনেক স্থানে তা জমির ওপর আটকে রয়েছে।

বিলের বিভিন্ন অংশে কচুরিপানার পুরু স্তর তৈরি হওয়ায় জমিতে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চাষ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রথমে শ্রমিক দিয়ে কচুরিপানা সরিয়ে জমি পরিষ্কার করতে হচ্ছে। এরপর জমি শুকিয়ে চাষাবাদের উপযোগী করতে হচ্ছে কৃষকদের।

সরেজমিনে কৃষকদের ব্যস্ততা

সরেজমিনে কান্দি-ঘুটিয়া-মহিষমারী বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি জমিতে দলবদ্ধভাবে কচুরিপানা পরিষ্কার করছেন কৃষকেরা। কেউ পানিতে নেমে কচুরিপানা টেনে তুলছেন, আবার কেউ জমির এক পাশে বা আইলের ওপর সেগুলো স্তূপ করে রাখছেন।

শ্রমিক সংকট এবং দীর্ঘ সময় ধরে কচুরিপানা পরিষ্কারের কারণে প্রতিদিন খুব অল্প পরিমাণ জমি পরিষ্কার করা সম্ভব হচ্ছে। এতে বোরো মৌসুমে সময়মতো জমি প্রস্তুত করা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

কৃষকেরা বলছেন, বোরো ধানের আবাদে জমি প্রস্তুত, বীজ, চারা, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন খাতে এমনিতেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। তার ওপর কচুরিপানা অপসারণের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হওয়ায় অনেকের জন্য এ মৌসুমে ধান চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতি বিঘায় খরচ ৭ হাজার টাকা

কৃষক মোহাম্মদ কাদের মুধা জানান, তার ১০ বিঘা জমিতেই কচুরিপানা জমে রয়েছে।

তিনি বলেন, কচুরিপানা পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছেন। প্রতি বিঘা জমি পরিষ্কার করতে প্রায় ৭ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে। এরই মধ্যে তিন বিঘা জমি পরিষ্কার করতে পেরেছেন। এখনো সাত বিঘা জমি পরিষ্কার করা বাকি।

তার মতো অনেক কৃষকই বড় পরিমাণ জমিতে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন।

বাড়তি খরচে দুশ্চিন্তায় কৃষক

কৃষক মোস্তফা প্রামাণিক ও শামসু মোল্লা বলেন, কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে ধান উৎপাদনের খরচ এমনিতেই বেশি। তেল, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যয়ের পাশাপাশি এখন কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্যও বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, জমি প্রস্তুত করতেই যদি এত টাকা খরচ হয়, তাহলে বোরো ধান ঘরে তুলতে গিয়ে মোট উৎপাদন ব্যয় আরও অনেক বেড়ে যাবে। এতে ধানের বাজারদর আশানুরূপ না হলে কৃষকের লোকসানের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

অনাবাদি থাকার আশঙ্কা ৪০ শতাংশ জমি

কৃষক সাদ্দাক, খোরশেদ ও কুদ্দু প্রামাণিক জানান, কচুরিপানা পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। একদিকে অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ, অন্যদিকে সময়মতো জমি প্রস্তুত করতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের দাবি, দ্রুত কচুরিপানা অপসারণ করা না গেলে বিলের প্রায় ৪০ শতাংশ জমি অনাবাদি থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব কৃষকের জমিতে কচুরিপানার স্তর বেশি পুরু, তাদের পক্ষে নিজস্ব অর্থে পুরো জমি পরিষ্কার করে বোরো আবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কৃষকদের আশঙ্কা, সময়মতো কচুরিপানা অপসারণ করা না গেলে শুধু চলতি বোরো মৌসুমের আবাদই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় কৃষকদের আয় ও খাদ্য উৎপাদনের ওপরও।

সরকারি উদ্যোগের দাবি

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা দ্রুত সরকারি উদ্যোগে কচুরিপানা অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় শ্রমিক, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করা গেলে অল্প সময়ে বড় এলাকার কচুরিপানা অপসারণ সম্ভব হতে পারে।

তারা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে কচুরিপানা সরানো গেলে কৃষকদের ব্যক্তিগত খরচ কমবে এবং সময়মতো জমি চাষের উপযোগী করা সম্ভব হবে। এতে বোরো আবাদও স্বাভাবিক রাখা যাবে।

এ জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনুর সহযোগিতাও কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।

কৃষি বিভাগের নজরদারি ও সহযোগিতার আশ্বাস

এ বিষয়ে সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদুল হাসান বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।

তিনি জানান, কৃষকেরা যাতে দ্রুত এ সমস্যা কাটিয়ে বোরো আবাদ শুরু করতে পারেন, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

সময়মতো কচুরিপানা অপসারণের দাবি

বোরো মৌসুমে সময়মতো জমি প্রস্তুত করা না গেলে কৃষকেরা যেমন ক্ষতির মুখে পড়বেন, তেমনি আবাদি জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কাও বাড়বে। তাই কৃষকদের দাবি, কচুরিপানা অপসারণকে জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত কচুরিপানা অপসারণ করা গেলে প্রায় ৩০০ একর জমিকে আবারও বোরো চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে শতাধিক কৃষকের অনিশ্চয়তা কাটবে এবং সময়মতো বোরো আবাদ নিশ্চিত করার পথও সহজ হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!