ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু, বাড়ছে পাচারের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু, বাড়ছে পাচারের ঝুঁকি

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু। তাদের একটি বড় অংশ অল্প বয়সেই প্রতারণা, প্রলোভন, জবরদস্তি কিংবা মানব পাচারের মাধ্যমে যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্টের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে শিশুদের নিয়ে উদ্বেগজনক এই চিত্র। শিশুদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যৌন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রায় ৪৫ শতাংশ শৈশবেই এই পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি, দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং পাচারকারীদের প্রতারণার কৌশল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এসব সংখ্যার সময়কাল, সংজ্ঞা ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি যাচাই করা জরুরি, যাতে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়।

প্রলোভন ও প্রতারণার ফাঁদে কন্যাশিশুরা

শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণের পেছনে কাজ করছে নানা ধরনের প্রতারণা ও অপরাধী চক্র। চাকরির প্রলোভন, ভালো জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতি, প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদ কিংবা পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত করে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করে জোরপূর্বক যৌন শোষণে বাধ্য করা হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে অপরাধীরা। ভুয়া পরিচয়, আকর্ষণীয় প্রস্তাব, উপহার কিংবা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে শিশুদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। পরে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল, নির্যাতন, পাচার কিংবা শোষণের ঝুঁকিতে ফেলার ঘটনা ঘটতে পারে।

পরিবারের আর্থিক সংকট, পারিবারিক ভাঙন, নির্যাতন, অবহেলা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব শিশুদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতিতে থাকা প্রতিটি শিশু শোষণের শিকার হবে—এমন নয়। বরং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের চিহ্নিত করে দ্রুত সহায়তা ও সুরক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

স্পা সেন্টার ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে শোষণের অভিযোগ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্পা সেন্টার, আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আড়ালে শিশুদের যৌন শোষণের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এসব জায়গায় অভিযান চালিয়ে শিশু উদ্ধারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা স্থানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; প্রয়োজন যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া।

অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। উদ্ধার করা শিশুদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখা, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিশুদের শোষণ করে যারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশ্বজুড়েই যৌন শোষণ বড় অপরাধমূলক অর্থনীতির অংশ

শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণ শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রম থেকে বছরে প্রায় ২৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবৈধ মুনাফা তৈরি হয়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে প্রায় ১৭২ বিলিয়ন ডলার আসে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বিপুল অর্থনৈতিক মুনাফা অপরাধী চক্রকে এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকতে উৎসাহিত করে। পাচার, জবরদস্তি ও শোষণের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা লাভবান হয়। ফলে এ অপরাধ দমনে শুধু ভুক্তভোগীদের উদ্ধার নয়, অপরাধের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অবৈধ আয় অনুসরণ করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও সাক্ষ্য-প্রমাণের সংকট

শিশুদের যৌন শোষণ ও মানব পাচারের মতো অপরাধ বন্ধে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার ঘাটতি। ঢাকা আহছানিয়া মিশনের কর্মকর্তা রেশমিন নাহার আশা বলেছেন, আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর ও বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেক আসামি জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। এতে অপরাধ দমনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

অন্যদিকে, পুলিশ বলছে, আদালতে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় অনেক মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। যৌন শোষণ ও পাচারের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুদের ভয়, সামাজিক কলঙ্কের আশঙ্কা, অপরাধীদের হুমকি কিংবা পরিবারের চাপের কারণে সাক্ষ্য দিতে অনীহা তৈরি হতে পারে। ফলে তদন্তের শুরু থেকেই শিশুদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তবে কোনো আসামি জামিনে মুক্তি পেলেই তিনি অপরাধী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, অপরাধের অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতা এবং প্রকৃত অপরাধীর দায় এড়ানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ, আলামত সংরক্ষণ এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের কার্যকর ভূমিকার দাবি

শিশু অধিকারকর্মী ও অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেছেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো শিশুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে কাজ করলেও এ ক্ষেত্রে সরকারকেই প্রধান ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের যৌন শোষণ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা, পাচার প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো, অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করতে হবে।

একই সঙ্গে উদ্ধার করা শিশুদের শুধু উদ্ধারকেন্দ্রে রাখা নয়, তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পারিবারিক পুনর্মিলন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি, যাতে উদ্ধার-পরবর্তী সময়ে তারা আবার শোষণ বা পাচারের ঝুঁকিতে না পড়ে।

সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। অপরিচিত ব্যক্তির চাকরি বা আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব, অনলাইনে গড়ে ওঠা সন্দেহজনক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি আদায়ের চেষ্টার বিষয়ে শিশুদের বয়সোপযোগী সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তবে প্রতিরোধের দায়িত্ব কখনোই শিশু বা ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়; অপরাধের দায় অপরাধীরই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষাবিষয়ক সচেতনতা, নির্যাতন বা পাচারের ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ, গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, পাচারের অভিযোগ এবং যৌন শোষণসংক্রান্ত মামলার তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও অপরাধের ধরন চিহ্নিত করা যেতে পারে।

দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। তবে প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণে পরিসংখ্যানের উৎস, সময়কাল ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি যাচাইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।

শিশুদের যৌন শোষণ বন্ধ করতে অপরাধীদের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। শুধু আলোচিত কয়েকটি ঘটনার বিচার নয়, প্রতিটি অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কন্যাশিশুর শৈশব, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রতারণা, পাচার ও যৌন শোষণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা এবং টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!