ঢাকা রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়ায় মাঠে কলাগাছ, শিক্ষকের কক্ষে তালা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়ায় মাঠে কলাগাছ, শিক্ষকের কক্ষে তালা

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ভালুকগাছি এলাকায় ছেলে ও পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়ার অভিযোগে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে কলাগাছ লাগিয়ে শিক্ষকদের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বাঁশ দিয়ে বেড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানের দাতা সদস্য আজাদ আলীর বিরুদ্ধে।

শনিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) উপজেলার ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুলে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে পুঠিয়া উপজেলার ভালুকগাছি গ্রামে ‘মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের অনুমতিও রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের সময় এর নাম ও কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর সঙ্গে দাতা সদস্য আজাদ আলীও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন দাতা সদস্য

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৫ আগস্ট রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা বৈঠকে বসে নতুন নাম হিসেবে ‘ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল’ নির্ধারণ করেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবও দাতা সদস্য আজাদ আলী দিয়েছিলেন।

তবে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও চাকরি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দাতা সদস্যের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বিরোধ তৈরি হয় বলে জানা গেছে।

মাঠে কলাগাছ, কার্যালয়ে তালা

শনিবার বিদ্যালয়ের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দাতা সদস্য আজাদ আলী কয়েকজন লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ সময় তারা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেন। পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকেও বেড়া দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের মাঠের বিভিন্ন স্থানে কলাগাছ লাগিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ও বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ছেলে-পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়ার অভিযোগ

বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য আজাদ আলী বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটির একজন দাতা সদস্য। তার দাবি, সেখানে একটি টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা ছিল এবং তার ছেলে ও ছেলের বউকে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

আজাদ আলীর ভাষ্য, এ কারণে তিনি প্রতিষ্ঠানকে জমি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার প্রত্যাশা অনুযায়ী টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি এবং তার ছেলের বউকেও চাকরি দেওয়া হয়নি।

এ কারণেই তিনি বিদ্যালয়ে তালা লাগানো এবং মাঠে কলাগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান।

তিনি বলেন, যে উদ্দেশ্যে তিনি জমি দিয়েছিলেন, সেই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে না—এমন অভিযোগ থেকেই তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

‘জমি এখন স্কুলের’—ইউএনও

ঘটনার বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান বলেন, দাতা সদস্য জমি দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু দলিলের মাধ্যমে জমি দেওয়ার পর সেটি এখন বিদ্যালয়ের সম্পত্তি।

তিনি বলেন, কোনো দলিল বৈধভাবে সম্পাদিত হওয়ার পর সেটি বাতিল করার এখতিয়ার সাধারণভাবে আদালতের। আদালতের মাধ্যমে দলিল বাতিল না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে ব্যক্তিগতভাবে তালা ঝুলানো বা গাছ লাগানোর সুযোগ নেই।

ইউএনও আরও বলেন, জমি ফেরত নিতে হলে আদালতের মাধ্যমে রায় নিয়ে আসতে হবে। বিদ্যালয়ে লাগানো কলাগাছ অপসারণ এবং তালা খোলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের পরামর্শ

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জমির মালিকানা বা ব্যবহারের অধিকার নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া বা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করে কোনো বিরোধের সমাধান করা যাবে না।

প্রশাসনের এই অবস্থানের ফলে বিদ্যালয়ের তালা খুলে দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ

স্থানীয়দের মতে, জমি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পক্ষের বিরোধ থাকলে আলোচনার মাধ্যমে কিংবা আইনগতভাবে তার সমাধান করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া বা প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, দাতা সদস্যের অভিযোগ—প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সময় যে প্রতিশ্রুতি বা প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য—জমি প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল হয়ে থাকলে তা আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া পরিবর্তন করা যাবে না।

ফলে জমির মালিকানা, প্রতিষ্ঠানের নাম, ব্যবস্থাপনা এবং চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তার আইনগত ও প্রশাসনিক সমাধানই এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগে বিদ্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!