আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা, শিক্ষকদের অধিকার, পেশাগত স্বাধীনতা ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও ২০২৩ সাল থেকে প্রতিবছর জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
তবে দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা যতই বাড়ছে, দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও থামছে না। বরং গত দুই থেকে আড়াই বছরে বেতন-ভাতা, বেতন গ্রেড, এমপিওভুক্তি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা, পদোন্নতি, জাতীয়করণসহ নানা দাবিতে শিক্ষকদের রাজপথের কর্মসূচি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলনের ধরন ও দাবি আলাদা হলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ে তাদের আন্দোলনে নামতে হচ্ছে।
শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্দোলনের পর দাবি পূরণ হয়েছে কিংবা আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে অধিকাংশ দাবির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, নীতিগত জটিলতা ও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে অসন্তোষ রয়ে গেছে। ফলে শিক্ষক দিবসের মূল বার্তা—শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা—কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ইতিহাস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সূচনা হয় ১৯৯৪ সালে। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও কর্মপরিবেশ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন।’
প্রতিপাদ্যেই শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে তাদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষককে এখনও তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে।
কোন কোন দাবিতে আন্দোলনে শিক্ষকরা?
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের কর্মসূচিতে বেশ কিছু দাবি বারবার সামনে এসেছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ
পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা নিরসন
এমপিওভুক্তি
বাড়িভাড়া বৃদ্ধি
চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি
উৎসব ভাতা বৃদ্ধি
জাতীয়করণ
অবসর সুবিধা নিশ্চিত করা
চাকরির নিরাপত্তা
পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি
শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা
নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ
দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য অবস্থান, মানববন্ধন, অনশন, সমাবেশ, স্মারকলিপি এবং বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষকরা। এসব কর্মসূচির কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশি বাধা ও নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে।
ইবতেদায়ি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে অনুদান ও জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। অবস্থান, মানববন্ধন ও অনশনের মতো কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা।
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি শিক্ষক ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় কমিটির দফতরবিষয়ক সম্পাদক নুরুল আমীনের দাবি, ৪২ বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতনবঞ্চিত।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারী ও জুনিয়র শিক্ষকরা ৩ হাজার ৩০০ টাকা হারে অনুদান পান। আরও ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান অনুদানের বাইরে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, ১৯৮৪ সাল থেকে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার কার্যক্রম চলছে। একসময় এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার হলেও বর্তমানে তা কমে ১০ থেকে ১১ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
নুরুল আমীনের দাবি, ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, শিক্ষক দিবসে যখন শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, তখন শিক্ষককেই কেন ন্যূনতম অধিকার ও সম্মান পাওয়ার জন্য রাজপথে দাঁড়াতে হবে?
প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ও পদোন্নতির দাবি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ, পদোন্নতি এবং উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনগুলোর বক্তব্য, দীর্ঘদিন একই পদে কাজ করেও অনেক শিক্ষক কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ১০ বছর ও ১৬ বছরে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি মু. মাহবুবর রহমানের দাবি, শিক্ষকদের জীবনমানের উন্নয়ন, আর্থিক সচ্ছলতা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
তার মতে, আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকলে শিক্ষকরা আরও মনোযোগ ও উদ্যম নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে পারবেন।
২৪ নম্বর জালগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মহিববুল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিনের বেতন-গ্রেড, পদোন্নতি ও পেশাগত বৈষম্যের সমাধান না হওয়ায় প্রাথমিকের শিক্ষকরা বারবার আন্দোলনে যাচ্ছেন।
তার মতে, শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের অন্যতম বড় বিষয় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা।
বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে ২০২৫ সালে শিক্ষকদের আন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। ধারাবাহিক কর্মসূচির পর বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শিক্ষকদের অন্যান্য দাবির অনেকগুলো এখনও আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিক্ষকদের বক্তব্য, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য দীর্ঘদিনের। এ বৈষম্য কমানোর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।
অনার্স-মাস্টার্সের সাড়ে তিন হাজার শিক্ষকও এমপিওর বাইরে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ে পাঠদানকারী প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষকও দীর্ঘদিন ধরে এমপিও সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
শিক্ষক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৯৫টি কলেজে এসব শিক্ষক পাঠদান করছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯২ সাল থেকেই তারা এমপিও সুবিধার বাইরে রয়েছেন বলে সংগঠনটির দাবি।
২০২৫ সালের নতুন এমপিও নীতিমালায় তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রাখা হলেও ২০২৬ সালেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানিয়েছেন।
বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেনের দাবি, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এ তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা এখনও এমপিও থেকে বঞ্চিত।
তার মতে, প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শিক্ষকের এমপিওভুক্তির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
‘শিক্ষকরা বরাবরই এক ধরনের উপেক্ষার মধ্যে রয়েছেন’
শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরীর মতে, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই শিক্ষকরা অধিকার ও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন করেন। তবে বাংলাদেশে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের এক ধরনের উপেক্ষার বিষয় রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বেতন-ভাতার বিষয় নয়, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রধান শিক্ষক কি কখনও একজন সচিবের সমকক্ষ মর্যাদা পান—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
তার মতে, বেতন-ভাতা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বঞ্চনা শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে কেউ কেউ কোচিং বা অন্যভাবে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হন।
একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং শিক্ষক ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
রাশেদা কে. চৌধূরীর মতে, শিক্ষা নিয়ে আলোচনা হলেও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। অথচ শিক্ষকদের আর্থিক বঞ্চনার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় সমস্যা।
‘প্রশ্নটা শুধু শিক্ষকের নয়, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার’
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, শিক্ষককে যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই শিক্ষককেই বারবার ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নামতে হওয়া শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত।
তার মতে, বিষয়টিকে শুধু বেতন-ভাতা বা তাৎক্ষণিক কোনো দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না।
শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন ও বদলি, বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, পেশাগত উন্নয়ন, কর্মপরিবেশ ও অবসর সুবিধার বিষয়ে সুস্পষ্ট, ন্যায়সংগত এবং পূর্বানুমানযোগ্য ক্যারিয়ার কাঠামো থাকা প্রয়োজন।
তিনি ইউনেস্কো-আইএলওর নির্দেশনা এবং এসডিজি-৪-এর লক্ষ্য অনুযায়ী যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, একটি সমন্বিত জাতীয় শিক্ষক নীতিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, স্বচ্ছ পদোন্নতি, নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ এবং সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার পথ থাকা উচিত।
‘শিক্ষকের অধিকার শ্রেণিকক্ষেই ফিরে পাওয়া উচিত’
মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সদ্য বিদায়ী অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ মনে করেন, বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের বারবার রাস্তায় নামতে হওয়া শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতিফলন।
তার মতে, প্রতিটি দাবি আলাদা আলাদা আন্দোলনের মাধ্যমে পূরণ করার পরিবর্তে সরকারকে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত।
বেতন-ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা, এমপিও, অবসর সুবিধা, পদোন্নতি, বদলি এবং চাকরির নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে শিক্ষকদের দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, মানসম্মত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তার ভাষায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে শিক্ষককে ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হবে না; বরং তিনি তার অধিকার শ্রেণিকক্ষেই ফিরে পাবেন—শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়ানোর মাধ্যমে।
কেন বারবার রাজপথে নামছেন শিক্ষকরা?
শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে শিক্ষকদের আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি কারণ সামনে আসে।
প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দাবির নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। দ্বিতীয়ত, এক স্তরের শিক্ষকের সঙ্গে অন্য স্তরের শিক্ষকের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য। তৃতীয়ত, ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতির পর বাস্তবায়নে ধীরগতি। চতুর্থত, পদোন্নতি ও বেতন গ্রেডের জটিলতা। পঞ্চমত, বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা ও আর্থিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা।
এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা। কোনো দাবি নিয়ে শিক্ষকরা আন্দোলনে নামার পর আলোচনা শুরু হওয়ার বদলে যদি দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি ঝুলে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একই দাবিতে আবার আন্দোলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
শিক্ষক দিবসের মূল বার্তা কতটা বাস্তব?
শিক্ষক দিবসে প্রতিবছর শিক্ষকদের ‘জাতি গড়ার কারিগর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু সেই শিক্ষকদের যদি বেতন-ভাতা, এমপিওভুক্তি, পদোন্নতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা সুবিধা কিংবা অবসর সুবিধার মতো মৌলিক অধিকার আদায়ে বারবার আন্দোলনে যেতে হয়, তাহলে দিবসটির আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে বাস্তবতার একটি বড় ব্যবধান থেকেই যায়।
শিক্ষকদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু শিক্ষকদের স্বার্থের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন।
একজন শিক্ষক আর্থিক ও পেশাগতভাবে নিরাপদ থাকলে তার পক্ষে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া, নতুন পদ্ধতিতে পাঠদান করা এবং শিক্ষার্থীদের পেছনে সময় দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। বিপরীতে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত বঞ্চনা শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক নীতি
শিক্ষক আন্দোলন বন্ধের স্থায়ী সমাধান হিসেবে সংশ্লিষ্টরা একটি সমন্বিত জাতীয় শিক্ষক নীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। যেখানে সরকারি-বেসরকারি সব স্তরের শিক্ষকদের নিয়োগ, বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, পেশাগত উন্নয়ন, বদলি, অবসর সুবিধা, চাকরির নিরাপত্তা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো সুস্পষ্ট থাকবে।
একই সঙ্গে সরকার, শিক্ষক প্রতিনিধি, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপের ব্যবস্থা থাকলে অনেক দাবি রাজপথের আন্দোলনে যাওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষক দিবস তাই কেবল ফুল, শুভেচ্ছা ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের দিন নয়; এটি শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবারও সুযোগ।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটাই—যে শিক্ষক জাতির ভবিষ্যৎ তৈরি করেন, সেই শিক্ষককে নিজের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য কেন বারবার রাজপথে নামতে হবে?

