শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ঝুঁকি—এসব কারণ সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রবণতা বাড়ছে। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) প্রতিবেদনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১১৪টি দেশে জাতীয় পর্যায়ে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা বিশ্বের মোট দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ।
২০২৩ সালের জুনে যেখানে এ ধরনের জাতীয় নিষেধাজ্ঞার হার ছিল ২৪ শতাংশ, ২০২৫ সালের শুরুতে তা বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৬ সালের মার্চে তা আরও বেড়ে ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বৈশ্বিক শিক্ষা-নীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের নীতি হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগ করার আগে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ, শিক্ষা ব্যবস্থার বৈচিত্র্য, পরিবারের সক্ষমতা, শিক্ষার্থীদের বয়স, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, শুধু মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর পাশাপাশি শিশুদের বিকল্প বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া এবং নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ
ইউনেস্কোর জিইএম প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ক্রোয়েশিয়া, জর্জিয়া, মালদ্বীপ ও মাল্টাসহ কয়েকটি দেশ স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
তবে সব দেশের নীতি একই ধরনের নয়। কোথাও পুরো স্কুল সময়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আবার কোথাও শুধু শ্রেণিকক্ষে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়েছে। কিছু দেশে শিক্ষার প্রয়োজনে, প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে একক কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে ৩৯টি অঙ্গরাজ্যে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি অঙ্গরাজ্যে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এবং ২৪টি অঙ্গরাজ্যে স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোকে মোবাইল ব্যবহারের নীতিমালা তৈরির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইংল্যান্ডেও স্কুলের দিনে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে স্কুলগুলোরও ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদাহরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোবাইল ফোনকে শুধু প্রযুক্তিগত ডিভাইস হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি শিক্ষা-নীতি বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষে মোবাইল কতটা প্রয়োজন?
মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের একটি বড় প্রশ্ন হলো—শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে, নাকি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে?
বর্তমানে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল বই, শিক্ষামূলক ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অনলাইন অভিধান এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে প্রযুক্তিকে শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে অবাধ স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, গেমিংয়ে অতিরিক্ত সময় দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি, অনুপযুক্ত কনটেন্ট দেখা এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরিই এখন শিক্ষা-নীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
‘মাধ্যমিক পর্যন্ত স্মার্টফোন না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত’
শিক্ষাবিদ, নাট্যকার ও নির্দেশক অধ্যাপক মলয় ভৌমিক মনে করেন, প্রযুক্তিকে অস্বীকার করে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত।
তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে নিউ মিডিয়াকে অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রেখে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
স্কুল পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধের পক্ষে মত দিয়ে মলয় ভৌমিক বলেন, অন্তত মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ‘বন্ধ’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটি নীতিমালায় স্পষ্ট করতে হবে।
তার মতে, স্কুলে মোবাইল নিষিদ্ধ থাকলেও পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত স্মার্টফোনের পরিবর্তে স্কুল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
শুধু স্কুলে ফোন বন্ধ করলেই হবে না
মলয় ভৌমিকের মতে, শুধু স্কুলে মোবাইল ফোন বন্ধ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। পরিবারের মধ্যেও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবারাই নিজেদের ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে মোবাইল ফোন বা গেমের দিকে ঠেলে দেন। শিশু যেন ব্যস্ত থাকে, সে জন্য তার হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়। ফলে ধীরে ধীরে শিশুর দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়ে।
তার মতে, অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের হাতে স্মার্টফোন না দেওয়া এবং মোবাইল গেম ও অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে তাদের দূরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
শুধু পরীক্ষার ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে শিশুদের গল্প, কবিতা ও অন্যান্য বই পড়া, ছবি আঁকা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
মলয় ভৌমিক বলেন, এসব বিকল্প সুযোগ না থাকায় অনেক শিশু ধীরে ধীরে মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়ছে। এখন অনেক শিক্ষার্থী মূল পাঠ্যবই বা গল্প-কবিতা পড়ার পরিবর্তে মোবাইলে তার সারাংশ খুঁজে নেয়।
তার মতে, গুগল বা এআইয়ের মাধ্যমে কোনো গল্প, কবিতা কিংবা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও মূল বক্তব্য সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে মূল লেখা না পড়ে খণ্ডিত তথ্যের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
শিক্ষার্থীর মূল্যায়নেও পরিবর্তন দরকার
মলয় ভৌমিকের মতে, শুধু খাতায় লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণও মূল্যায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন বা এআই থেকে উত্তর সংগ্রহ করে আনছে কি না, সেটিও শিক্ষকদের বিবেচনায় রাখতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, যেসব দেশে স্কুলে মোবাইল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আগে দেখা দরকার।
বাংলাদেশে সরকারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ও বিভিন্ন ধারার মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একটি দেশের নীতি সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ না করে দেশের নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে নীতি তৈরি করা প্রয়োজন।
‘শুধু মোবাইল বন্ধ নয়, বিকল্প সুযোগও তৈরি করতে হবে’
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, মোবাইল ফোন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, অনেক দেশে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও ঝুঁকিপূর্ণ ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। অভিভাবকেরা চাইলে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন কনটেন্ট ব্লক করতে পারেন।
তবে স্কুলে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বাড়িতেও মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, এ ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকদেরও নীতির অংশ করতে হবে। পরিবারে সন্তান কখন, কতক্ষণ এবং কী উদ্দেশ্যে মোবাইল ব্যবহার করছে—সেটি নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক সময় কোনো সমস্যা বড় আকার ধারণ করার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও আগেভাগে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
মাঠ ও খেলাধুলার সুযোগ কমছে
রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, শিশুদের শুধু মোবাইল ফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না, তাদের বিকল্প সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি করতে হবে।
করোনার সময় থেকে শিশুদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস বেড়েছে। একই সময়ে খেলাধুলার মাঠ, সাঁতার কিংবা বাইরে দৌড়ঝাঁপের সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। ফলে শিশুরা ঘরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
তিনি শিশুদের জন্য গল্প বলা, ছবি আঁকা, খেলাধুলা এবং অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তার ভাষায়, বিকল্প ব্যবস্থা না করে শুধু মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ—সব পর্যায়েই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সাইবার বিশেষজ্ঞ
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন মনে করেন, বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে শ্রেণি চলাকালীন স্মার্টফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ অথবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যৌক্তিক।
তার মতে, করোনা মহামারি ও পরবর্তী সময়ে স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গেমিংয়ের আসক্তিও বেড়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মোবাইল গেমের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বের করে আনতে পরিবার, বিদ্যালয় এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ, বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের নিজেদের মোবাইল ব্যবহারে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে স্কুলে বিতর্ক, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান ক্লাব, আইটি মেলা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রম নিয়মিত আয়োজনের পরামর্শ দেন তিনি। এতে শিক্ষার্থীরা মোবাইলের বাইরে নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পাবে বলে মনে করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞার বদলে বয়সভিত্তিক ব্যবহারবিধি?
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, বিশ্বজুড়ে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এখন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা-নীতি বিষয় হলেও এটিকে শুধু ‘মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ’ হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
তার মতে, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে মোবাইল ফোনের পাশাপাশি ল্যাপটপ, আইপ্যাডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস শিক্ষার অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিস্তার শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে স্থানীয় বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠানের ধরন, শিক্ষার্থীদের বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যবহারবিধি তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
কোথায়, কখন এবং কী উদ্দেশ্যে মোবাইল বা অন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষক-অভিভাবক দুপক্ষেরই দায়িত্ব
মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হলে শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করলেই হবে না। শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও একই নীতির আওতায় আনতে হবে।
বিদ্যালয়ে ফোন জমা রাখার ব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগের বিকল্প নম্বর, শিক্ষামূলক প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত ডিভাইস ব্যবহার এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে নির্দিষ্ট সময়ে ফোন ব্যবহারের সুযোগ—এ ধরনের মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে।
একইভাবে অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি, শিশুদের স্ক্রিন টাইম ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর কনটেন্ট ফিল্টার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বয়সভিত্তিক নির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুকে শুধু ‘ফোন ব্যবহার করবে না’ বলা যথেষ্ট নয়। কেন ব্যবহার করা যাবে না, কী ঝুঁকি রয়েছে এবং অবসর সময়ে কী করা যাবে—সেটিও তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে।
ডিজিটাল দক্ষতা শেখানোও জরুরি
বিশ্বজুড়ে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়লেও এর অর্থ প্রযুক্তিকে শিক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে।
শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা, সাইবার বুলিং মোকাবিলা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং এআইয়ের সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব হবে না। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি ডিজিটাল নাগরিকত্বের ধারণাও শিক্ষার অংশ হওয়া দরকার।
বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের নীতি হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, সব বয়সের শিক্ষার্থীর জন্য একই নিয়ম না করে বয়সভিত্তিক নীতি তৈরি করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিকক্ষে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও জরুরি যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শিক্ষামূলক প্রয়োজনে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ থাকলে সেটি শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে করা যেতে পারে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাভ্যাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রযুক্তি ও এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
মোবাইল বন্ধের প্রশ্নের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নও জড়িত
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট, স্কুলে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ শুধু একটি ডিভাইস নিষিদ্ধ করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি, খেলাধুলার সুযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতি বাংলাদেশের জন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগতে পারে। তবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, পরিবারের সক্ষমতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রয়োজন বিবেচনা না করে কোনো দেশের নীতি সরাসরি অনুসরণ করলে তা প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
তাই বাংলাদেশে স্কুলে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে, নাকি বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারবিধি তৈরি করা হবে—এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিক্ষার্থীদের কীভাবে মোবাইলের ক্ষতিকর ব্যবহার থেকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে এবং একই সঙ্গে তাদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা শেখানো যাবে।
কারণ শিশুদের হাতে প্রযুক্তি থাকবে কি না, শুধু সেটিই নয়; সেই প্রযুক্তি তারা কীভাবে, কতক্ষণ এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, সেটিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

