আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারিতে আসা দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়িক গ্রুপ সামিটের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত ও নথি পর্যালোচনায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি আয়কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ বিতরণে উৎসে কর না কাটার অভিযোগে প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা এবং তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথি উন্মোচনের পর আয় গোপনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আরও প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা কর ফাঁকির তথ্য মিলেছে।
তবে এনবিআরের এসব দাবি ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে সামিট গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান মেনেই কর পরিশোধ করেছে। এনবিআরের দাবির বিরুদ্ধে গ্রুপটির কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে রিটও করেছে। এসব মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।
ডিভিডেন্ডেই ৯৬৩ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ
সামিট গ্রুপের ব্যবসার বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে। গ্রুপটির কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেসরকারি খাতে উৎপাদিত বিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেডের প্রায় ৬৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক সামিট করপোরেশন। এনবিআরের অভিযোগ, সামিট পাওয়ারের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামিট করপোরেশনকে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সময় প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর কর্তন করেনি।
ডিভিডেন্ডে ৯৬৩ কোটি, তিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথিতে আরও ১,০২০ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য | অভিযোগ অস্বীকার সামিটের
এতে বিপুল পরিমাণ কর সরকারের কোষাগারে জমা হয়নি বলে মনে করছে এনবিআর। সংস্থাটির হিসাবে এ খাতেই কর ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সাবেক এনবিআর সদস্য খাইরুল ইসলাম বলেন, কোনো কোম্পানি অন্য কোনো কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড দিলে প্রচলিত আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হারে উৎসে কর কর্তনের বিষয়টি প্রযোজ্য। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে এনবিআরের আইনগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাত কোম্পানিতে শত শত কোটি টাকার দাবি
এনবিআরের হিসাবে সামিট গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী—
সামিট পাওয়ার লিমিটেড—৭ বছরে প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা;
সামিট গাজীপুর-২—৩ বছরে প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা;
সামিট বরিশাল পাওয়ার—৪ বছরে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা;
সামিট মেঘনাঘাট—৬ বছরে প্রায় ৯৩ কোটি টাকা;
সামিট নারায়ণগঞ্জ ইউনিট-২—৩ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা;
সামিট এলএনজি টার্মিনাল—৩ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা;
সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার—৬ বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা।
এনবিআরের এই হিসাব ও দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে সামিট গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ আদালতে রিট করেছে। এসব মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান বলেন, সামিট গ্রুপের মামলাগুলো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে এবং শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে আদালতে আসছে।
নথি উন্মোচনে সামনে আরও ১ হাজার ২০ কোটি
ডিভিডেন্ড থেকে উৎসে কর আদায় না করার অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে আয়কর আইনের ধারা ২১২ অনুযায়ী সামিট পাওয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি উন্মোচনের উদ্যোগ নেয় এনবিআর।
নথিপত্র পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আয় গোপনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
এর মধ্যে—
সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড: চার বছরে প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ।
সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার লিমিটেড: পাঁচ বছরে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ।
সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেড: নয় বছরে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ।
অর্থাৎ ডিভিডেন্ডের উৎসে কর সংক্রান্ত দাবির বাইরে নথি উন্মোচনের মাধ্যমে পাওয়া এসব দাবিও যোগ করলে সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে এনবিআরের উত্থাপিত কর ফাঁকির অঙ্ক দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কেন এত বড় অঙ্কের কর দাবি
রাজস্ব কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোম্পানির আয়, ডিভিডেন্ড, সংশ্লিষ্ট লেনদেন, আর্থিক বিবরণী ও অন্যান্য নথি বিশ্লেষণ করা হয়। কোনো আয় বা লেনদেন করযোগ্য হওয়ার পরও তা যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত না হলে বা প্রযোজ্য উৎসে কর কর্তন না হলে অতিরিক্ত করের দাবি তৈরি হতে পারে।
সামিটের ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড বিতরণে উৎসে কর কর্তনের বিষয়টি যেমন সামনে এসেছে, তেমনি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথি উন্মোচনের পর আয় গোপন ও অন্যান্য কর-সংক্রান্ত অসঙ্গতির অভিযোগও পেয়েছে এনবিআর।
তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে বিচারাধীন। ফলে এনবিআরের নির্ধারণ করা পুরো অর্থই চূড়ান্তভাবে সরকারের পাওনা—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া প্রয়োজন।
উচ্চ আদালতে সামিটের চ্যালেঞ্জ
এনবিআরের কর দাবির বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ আদালতে রিট করেছে। ফলে একদিকে এনবিআর তাদের দাবির পক্ষে নথিপত্র ও আইনগত অবস্থান তুলে ধরছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতে এসব দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করছে।
আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর ফাঁকির অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে না।
সামিটের বক্তব্য
কর ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে জানতে সামিট গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে লিখিত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সামিটের দাবি, তারা প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী তাদের ওপর প্রযোজ্য সব ধরনের কর পরিশোধ করেছে। এনবিআরের উত্থাপিত দাবির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে এবং বিষয়গুলো যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর নিষ্পত্তি হবে বলে জানিয়েছে গ্রুপটি।
বিদ্যুৎ খাতের বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজস্ব তদন্ত
সামিট গ্রুপ দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। গ্রুপটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি টার্মিনালসহ জ্বালানি অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ রয়েছে।
ফলে এত বড় একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকির অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি রাজস্ব প্রশাসনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে ডিভিডেন্ড থেকে উৎসে কর কর্তন এবং বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয়কর নথি উন্মোচনের পর নতুন করে আরও কী তথ্য সামনে আসে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এনবিআরের তদন্তাধীন অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও যদি একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে কর দাবির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

