রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে ওঠা অযোগ্যতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে পদাবনতি করে সহকারী অধ্যাপক করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাঁচ বছর পর তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বে ফেরার যোগ্য হবেন। এরপর নিয়ম অনুযায়ী আরও চার বছর পর সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ পদমর্যাদা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি মোট নয় বছর পিছিয়ে গেলেন। একই সঙ্গে পাঁচ বছর কোনো ধরনের ইনক্রিমেন্টও পাবেন না।
রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ, শাস্তির সিদ্ধান্ত
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অযোগ্যতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে আসছিলেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এসব অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিক ধাপে তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
গত বছরের ২৫ আগস্ট শিক্ষার্থীরা তাকে বিভাগের কার্যক্রমে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পরে ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ছাত্র উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সভাপতির কাছে প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগের সঙ্গে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছিল বলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় ড. সুজন সেনকে বিভাগের সব কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে ১৮ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ধারায় দ্বিতীয় দফা তদন্ত
প্রাথমিক তদন্তের পর বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩-এর ৫৫(৩) ধারা অনুযায়ী ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটিতে সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২ সদস্য হিসেবে ছিলেন। এ ছাড়া ড. সুজন সেনের মনোনীত একজন প্রতিনিধিকেও কমিটিতে রাখা হয়।
গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত রাবি সিন্ডিকেটের ৫৩৭তম সভায় এ-সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পাঁচ বছর একাডেমিক-প্রশাসনিক দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের পর তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তাকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনতি করা হয়েছে।’
রেজিস্ট্রার আরও বলেন, ‘লেকচারার থেকে একজন শিক্ষক যখন সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন, বর্তমানে তার পদ সেই পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর পর তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের যোগ্য হবেন। এরপর আরও চার বছর পর সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ তাকে মোট নয় বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছর তিনি কোনো ধরনের ইনক্রিমেন্টও পাবেন না।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ থেকে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত
ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর বিষয়টি ধাপে ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রথমে বিভাগীয় কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি, পরে তদন্ত কমিটি গঠন এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের নির্ধারিত ধারায় আরও তদন্ত—সবশেষে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হলো।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, পদাবনতি এবং আর্থিক সুবিধা স্থগিতের মতো একাধিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বাইরে অভিযোগগুলোর নির্দিষ্ট আর্থিক বা প্রশাসনিক দিক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত সেসব অভিযোগের পৃথক বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রধান বিষয়। ড. সুজন সেনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে সিন্ডিকেটের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সেই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অংশ হিসেবেই দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

